দেবাশিস দত্ত,এডিলেড: সত্যি।বিরাট কোহলি বিচ্ছিরি ভাবে আউট হয়েছেন।অতি সত্যি।বিরাট কোহলি বড় রান না পেলে ভারতীয় শিবিরকে ডুবন্ত নৌকা মনে হয়। ৩ উইকেটে ১৯, ৪ উইকেটে ৪১, ৫ উইকেটে ৮৬— এই অবস্থাকে কতটা বিপজ্জনক মনে হয়?‌ মাঝি যেন চিৎকার করে বলছে, নৌকা বঁাচাও, নৌকা বঁাচাও। মরণাপন্ন রোগীর সঙ্গেও তুলনা করা যায়। ওই অবস্থা থেকে ২৪৬ বলে ১২৩ রান করে চেতেশ্বর পুজারা ডুবুরির ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। ডুবতে বসেছিল ভারতীয় শিবির। সেখান থেকে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে ডুবন্ত নৌকাটাকে কোনওরকমে পাড়ের কাছে নিয়ে এসেছেন। এমন উদ্ধারকর্তাকে প্রায় ৬ ঘণ্টা (‌কারণ ক্রিজে এসেছিলেন তিনি ১৩ নম্বর বলে, কে এল রাহুল আউট হওয়ার পর)‌ ক্রিজে থাকতে হয়েছিল। তিনিও ইচ্ছে করলে অজিঙ্ক রাহানে, রোহিত শর্মা এবং ঋষভ পন্থের মতো সেট হয়ে যাওয়ার পর নিজের উইকেট ছুঁড়ে দিয়ে আসতে পারতেন। সেখানে পুজারা ছিলেন মূর্তিমান ব্যতিক্রম। সময় যত এগিয়েছে, তত তিনি নিজের ব্যাটকে আরও চওড়া করে, ডিফেন্সকে মজবুত করে, ডালপালা বিস্তার করে ২২ গজে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। অথচ প্রথম ৪ ঘণ্টায় অস্ট্রেলিয়াকে মনে হচ্ছিল হেমন্তের রঙিন পাতায় ঝলমল। এডিলেডের মাঠের আশপাশে নানা রঙের গোলাপ ফুলের ছড়াছড়ি। টসে হেরে প্রথম বোলিং করার সুযোগ পেয়ে মিচেল স্টার্করা যেভাবে দাপাদাপি শুরু করেছিলেন, তাতে ব্র‌্যাডম্যানের স্মৃতিবিজড়িত মাঠে সকাল এবং দুপুরে পাওয়া গেল অস্ট্রেলীয়–‌গোলাপের গন্ধ। ফ্যালফ্যালে দুপুরের পর খানিকটা স্বস্তির বিকেলে ফিরল ভারত পুজারার ব্যাটে চড়ে। দিনের শেষে মিড অন থেকে কামিন্স শরীর ছুঁড়ে দিয়ে এক টিপে নন–‌স্ট্রাইকার প্রান্তের উইকেট ভেঙে পুজারাকে রান আউট করে দিলেন। তারপর আর খেলা হয়নি। ভারত ঘুমোতে গেল ৯ উইকেটে ২৫০ রান তুলে। পুজারা যদি তঁার ১৬ নম্বর টেস্ট সেঞ্চুরিটা না তুলতে পারতেন, তাহলে পরিস্থিতি কেমন দঁাড়াত, সেটা কল্পনা করে নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।
আবার কে এল রাহুল ব্যর্থ!‌ অফস্টাম্পের বাইরের বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে ফিরে গেলেন ২ রান করে। বোলার হ্যাজেলউড। তঁার সঙ্গী মুরলী বিজয় ড্রাইভ করতে গিয়েই ধরা পড়লেন উইকেটরক্ষক পেইনের হাতে। ওপেনাররা আবার ব্যর্থ। ক্রিকেট যঁারা বেশি বোঝেন না, তঁারাও কিন্তু এ কথা বলবেন যে, ফর্মে না–‌থাকা ক্রিকেটারকে, শুধুই ঘনিষ্ঠতার কারণে সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। নিউজিল্যান্ডেই রয়েছেন ভারত ‘‌এ’‌ দলের হয়ে খেলতে যাওয়া ময়াঙ্ক আগরওয়াল। পৃথ্বী শ–‌কে যখন মেলবোর্ন টেস্টের আগে পাওয়া যাবে না, তখন ময়াঙ্ককে উড়িয়ে আনতে আপত্তি কোথায়?‌ (‌রবি শাস্ত্রী–‌বিরাট কোহলি জুটি নানা কাজের কারণে বোর্ডের কাছে নানা আবদার করেছেন। ময়াঙ্ককে পার্থে উড়িয়ে আনার আবদারটা করা যায়?‌)‌।
এবার বিরাট কোহলি। কট খোয়াজা বল কামিন্স। তঁাকে আউট করার জন্য অসি বোলারদের এই পরামর্শ দিয়ে মাঠে পাঠানো হয়েছিল যে, অফস্টাম্পের বাইরে ড্রাইভ করার বল ক্রমাগত করে যাও.‌.‌.‌। সেই ফঁাদে পা দিয়ে বিরাট ড্রাইভ করতে গিয়েছিলেন। বল উড়ে যাচ্ছিল ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টের বঁাদিক থেকে। ওখানেই শূন্যে লাফিয়ে বঁাদিকে শরীর ছুঁড়ে দিয়ে শুধুমাত্র বঁা হাতে ক্যাচটা ধরে মাটিতে পড়তেই যে গগনভেদী চিৎকার শুনলাম আমরা, তাতে ছিল বিস্ময় ও উল্লাসের গান। হতভম্ব মুখে দঁাড়িয়ে বিরাট, অসহায় দৃষ্টি। নিজে বিশ্বাস করতে পারছেন না। অস্ট্রেলিয়াও কি পারছিল?‌
কোথায় গেল সেই অঙ্গীকার?‌ ভুল শুধরে খেলবেন তঁার দলের ব্যাটসম্যানরা। এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভারত অধিনায়ক। তঁার কথা আলাদা। অতিমানবীয় দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি যে মাঝেমধ্যে তাড়াতাড়ি অপ্রত্যাশিত ভাবে আউট হবেন, এটাও তো মেনে নিতে হবে। কিন্তু বাকিরা!‌ ওপেনারদের সম্পর্কে যত কম কথা বলা যায়, ততই ভাল। দলের বিপদে ৬১ বলে ৩৭ রান করলেন বটে, বহুদিন পর টেস্ট ক্রিকেটে ফিরে আসা রোহিত শর্মা। ২টি চার মেরেছেন, ৩টি ছয় মেরেছেন। বল ততক্ষণে অনেক নরম হয়ে গেছে। পিচ থেকে তাজা ভাব ক্রমশ উধাও হয়ে যাচ্ছিল। এই সময় তো জঁাকিয়ে বসার কথা!‌ সেখানে কিনা লায়নকে ছয় মারতে গিয়ে, বাড়তি বাউন্সের তোয়াক্কা না করে, উঁচু ক্যাচ দিয়ে ফিরে গেলেন। মুম্বইয়ের ক্রিকেটার। তিনি রোহিত শর্মা। হনুমা বিহারির মতো ক্রিকেটারকে বসিয়ে তিনি খেলছেন তুড়ি মেরে। কিন্তু সেট হয়ে যাওয়ার পর এভাবে আউট হয়ে যাওয়াটা যে অমার্জনীয় অপরাধ, এটা বিনোদ রাইরা তঁাকে ডেকে বলে দেবেন?‌ ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী আমরা। তাই রোহিত পার পেয়ে যাবেন। পার্থ টেস্টেও খেলবেন। যেমন একই অপরাধে কোনও শাস্তি হবে না অজিঙ্ক রাহানে এবং ঋষভ পন্থেরও। পুজারার সঙ্গে রোহিতের জুটিতে যেভাবে ৪৫ রান যোগ হয়েছিল, তা চলতে থাকলে ভারতকে দিনের শেষে এতটা গাড্ডায় থাকতে হত না।
রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে বিশেষ পছন্দ নয় টিম ম্যানেজমেন্টের। আড়ালে তঁাকে ডাকা হয় সায়েন্টিস্ট বলে। মুখের ওপর স্পষ্ট কথা বলে দেন। যুক্তি দিয়ে কথা বলেন। তিনি কিন্তু ৭৬ বল খেললেন, ৩৯ ডিগ্রি গরমে কাহিল না হয়ে। করলেন ২৫ রান। অথচ স্বীকৃত ব্যাটসম্যানরা, যে যঁার মতো উইকেট ছুঁড়ে দিয়ে দিব্যি প্যাভিলিয়নের শীতাতপ–‌নিয়ন্ত্রিত ঘরে সময় কাটালেন।
পিচে ঘাস আছে। ঘিয়ে রঙের পিচে যে ঘাস রয়েছে, তাতে প্রাণ কম। ৩৯ ডিগ্রি গরমে ওই ঘাস আরও কাবু হয়ে যাবে ক্রমশ। গতি কমবে। এই অবস্থায় বুমরা, ইশান্ত, সামিরা যদি আগুনে বোলিং করতে পারেন, তা হলে অস্ট্রেলিয়া ইনিংসও যে কঁাপবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে ‘‌অস্ট্রেলিয়ানইজম’‌ বলে যে শব্দটা আছে, তাকে উপেক্ষা করা কঠিন। বহু ম্যাচ অসি শিবির বঁাচিয়ে ফেলেছে অখ্যাত ক্রিকেটারদের দক্ষতায়। তেমন ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পুনশ্চঃ এদিন চেতেশ্বর পুজারা যখন ৯৯ রানে অপরাজিত ছিলেন, তখন তিনি টেস্ট ক্রিকেটে ৫০০০ রান ক্লাবের সদস্যপদ পেলেন। আরেকটি চমকপ্রদ পরিসংখ্যান হাতে এল। তিনি এবং রাহুল দ্রাবিড় দুজনেই ৩০০০, ৪০০০ এবং ৫০০০ রান ক্লাবের সদস্যপদ পেলেন যথাক্রমে ৬৭, ৮৪ এবং ১০৮ ইনিংসের মাথায়। নেহাতই কাকতালীয়।‌‌‌

 

এডিলেডে শতরানের পর চেতেশ্বর পুজারা। ছবি: এএফপি

জনপ্রিয়

Back To Top