বিভাস ভট্টাচার্য: জীবনের অবলম্বন এখন একমাত্র নাতি। ১১ বছরের গোপাল মণ্ডল। আর মেয়ে বন্দনা মণ্ডল। বন্দনার স্বামী মারা গেছেন আগেই। ফলে মেয়ে আর নাতিকে নিয়েই সংসার বৌবাজারের সুধা হালদারের। ইস্ট–ওয়েস্ট মেট্রোর সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ে তঁাদের ৩, গৌর দে লেনের ঘরে ফাটল ধরেছে। ফলে ঝঁুকি না নিয়ে কলকাতা মেট্রো রেল কর্পোরেশন লিমিটেড (‌কেএমআরসিএল)‌ তঁাদের সবাইকে এখন ধর্মতলার কাছে একটি হোটেলে রেখেছে। কিন্তু নাতির টানে বৃদ্ধা সুধাদেবী ঝঁুকি নিয়েই প্রতিদিন ফিরে আসেন গৌর দে লেনে। কারণ, অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা নাতির পোষা রঙিন মাছগুলি যাতে না খেয়ে থাকে। সঙ্গে কোনও কোনও দিন আসেন তঁার মেয়ে বন্দনাও। মাছগুলিকে খাইয়ে ফের ফিরে যান হোটেলে। 
জীবনের ঝঁুকি কি নেই?‌ যদি দুর্ঘটনা ঘটে?‌ পরোয়া করেন না সুধাদেবী। বুধবার অ্যাকুয়ারিয়ামে খাবার দিতে দিতে তিনি বলছিলেন, ‘‌যদি ভেঙে পড়ে তো পড়বে। মরব। কিন্তু গোপাল মাছগুলিকে খুব ভালবাসে। ও কেঁদে বলে, মাছগুলোকে যদি না খাওয়ানো হয় তবে মরে যাবে। ওর মুখের দিকে তাকিয়েই আসি। ও বায়না করে। আসতে চায়। কিন্তু নিয়ে আসি না। প্রতিদিন গিয়ে গল্প করতে হয় মাছগুলো খাওয়ার সময় চুপচাপ ছিল, না দৌড়দৌড়ি করছিল। বা কোন মাছ কতটা বড় হল।’‌ গোপাল স্থানীয় একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। অভাবের সংসার। মা বন্দনা মণ্ডল লোকের বাড়ি রান্না করে ছেলের পড়ার খরচ ও সংসার চালানোর অর্থ উপার্জন করেন। মাছের প্রসঙ্গে বলছিলেন, গোপাল আগে বালতির মধ্যে রঙিন মাছ পুষত। আমার কাছে বায়না ধরেছিল অ্যাকুয়ারিয়াম কিনে দেওয়ার জন্য। আমি বলেছিলাম, পরীক্ষায় যদি ভাল ফল করতে পারিস তবে কিনে দেব। যখন ভাল ফল করল তখন আমি ওকে নিয়েই দোকানে কিনতে গেছিলাম। যখন ঘর ছাড়ি তখন ও অনেকবার বলেছিল মাছগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু হোটেলে কোথায় নিয়ে রাখব বা নিয়ে যাওয়ার সময় অ্যাকুয়ারিয়ামটা ভেঙে পড়তে পারে, এই ভয়েই নিয়ে যাইনি। কারণ, মাছের যদি কিছু হয় তবে গোপাল খুবই কষ্ট পাবে। ৩, গৌর দে লেনের যে বাড়িতে তঁারা থাকতেন সেই বাড়িতে আরও ১৮টি পরিবার থাকে। সকলেরই ছোট ছোট ঘর। বিপর্যয়ের পর সবাইকেই আপাতত সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে গোটা বাড়িটাই এখন জনশূন্য। বন্দনা জানালেন, বাড়িতে অনেকগুলো বিড়াল ছিল। এখন একটাও নেই।
বুধবার কেএমআরসিএল নিয়োজিত বিশেষজ্ঞ কমিটি রিপোর্ট জমা দিয়েছে। কমিটির মতে, ওই এলাকায় মোট ২৭টি বাড়ি ভাঙতে হবে। আরও ২৭টি বাড়ি এই ঘটনায় কোনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

জনপ্রিয়

Back To Top