‌রিনা ভট্টাচার্য
সোমবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‌‘‌প্রতিদিন করোনায় যেমন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, অনেকে ভালও হয়ে যাচ্ছেন। আমি আশাবাদী। আতঙ্কিত না হয়ে লড়াই করার সাহস সঞ্চয় করতে হবে।’‌
তথ্য–পরিসংখ্যান দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তেহট্টের আক্রান্ত ৫ জনের সঙ্গে ইউকে–র যোগ ছিল। এগরার আক্রান্তরাও একটি বিয়েবাড়িতে গিয়েছিলেন, সেখানেও বিদেশি সংযোগ ছিল। কালিম্পঙে একই পরিবারের ১১ জন আক্রান্ত। তঁারাও চেন্নাই থেকে এসেছেন। এ ছাড়া হাওড়ায় ৮ জন আক্রান্ত। কলকাতায় ১২ এবং হলদিয়ায় ২ জন। ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তঁারা খুব আশঙ্কাজনক অবস্থায় এসেছিলেন। ভাল দিক হল, ১৩ জন ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। কালিম্পঙে ১০ জনের মধ্যে ৪ জনের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। বেলেঘাটায় ভর্তি ১৭ জনের মধ্যে ১২ জন সুস্থ হয়ে উঠছেন। তাই ঘাবড়াবার কিছু নেই। নিয়ম মেনে চললে, সতর্ক থাকলে কোনও সমস্যা হবে না।’‌
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌এ রাজ্যে গৃহবন্দি রয়েছেন ৫৪ হাজার ৮২৩ জন। তঁারা ঠিকমতো নিয়ম মেনে থাকছেন কি না, তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই গৃহবন্দি–‌দশা থেকে মুক্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৪৯ জন। সরকারি কোয়ারেন্টিন সেন্টারের সংখ্যা, অর্থাৎ সেফ হাউসের সংখ্যা ৫১১। এই সব কেন্দ্রে রয়েছেন ৬ হাজার ৮৮৯ জন। মুক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৭৯। রাজ্যের কোভিড হাসপাতালের সংখ্যা ৫৯। তার মধ্যে কলকাতাতেই ৪টে রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, ‘‌আমাদের হাতে প্রথমে মাত্র ৪০টি কিট ছিল। তখন পরীক্ষা করার উপায়ও ছিল না। তা সত্ত্বেও আমাদের নিজেদের চেষ্টায় ১ হাজার ৩১১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এসএসকেএমে ৪৪৯টি, নাইসেডে ৬১০, ট্রপিক্যালে ৭৮, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে ৭৩, উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে ১৩১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। বাকি ২টি বেসরকারি হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও হয়নি সেখানে।’‌
যঁারা কিডনির সমস্যা, শুগার বেশি, হৃদরোগ ভুগছেন বা যঁাদের হাই ব্লাডপ্রেশার, হাইপারটেনশন রয়েছে, তঁারা করোনা–‌আক্রান্ত হলে এবং কলকাতায় থাকলে মুখ্যমন্ত্রী বাঙ্গুরে ভর্তি হতে অনুরোধ করেন। তিনি জানান, ‘‌এ–‌সব ক্ষেত্রে এসএসকেএম, এনআরএস বা মেডিক্যালে যাওয়ার দরকার নেই। বাঙ্গুরেই উপযুক্ত পরিকাঠামো রয়েছে। ভেন্টিলেটর না থাকলে এই রোগ সারবে না, এ–‌রকম ভাবার কোনও কারণ নেই বলে মনে করেন মুখ্যমন্ত্রী। তঁার কথায়, বেলেঘাটায় যঁারা সুস্থ হচ্ছেন, তঁারা ভেন্টিলেশন ছাড়াই হচ্ছেন। চিকিৎসকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। চিকিৎসা করার সুযোগ দিতে হবে।’‌ রাজ্যবাসীর কাছে মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ, এই রোগে আক্রান্ত হলে সেই তথ্য যেন না লুকোনো হয়। না জেনে চিকিৎসকেরা চিকিৎসা করলে তঁাদেরও বিপদ। এই সময়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাল থাকা খুব প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, অনেকে ঠিকমতো প্রথম থেকে চিকিৎসা করাচ্ছেন না। পরে সরকারের ঘাড়ে দোষ দিয়ে দিচ্ছেন।
এদিনও মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যবাসীর কাছে অনুরোধ করেন, ‘‌দূরত্ব বজায় রেখে চলুন। বাংলায় শাকসবজি, খাদ্যশস্য, মাছ, ডিমের কোনও অভাব নেই। কোথাও কোথাও রেশন দোকানে খাদ্যশস্য দেওয়ার সমস্যা হচ্ছে। সেই সব জায়গায় ভিড় এড়াতে কুপন দেওয়া হবে।’
করোনা–‌আক্রান্ত ব্যক্তিকে পাড়া থেকে তাড়ানো চলবে না। তঁার বাড়িতে হুজ্জতি করা যাবে না। মুখ্যমন্ত্রী এ ব্যাপারে এদিন কড়া হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ‘‌নিজেরা সতর্ক থাকলেই সমস্যা মিটবে। কেউ ডায়েটিং করবেন না। এখন রোগ–‌প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পেট ভরে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খান। বাড়িতে কিছু না–‌থাকলে ডাল, আলু সেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ, কঁাচা লঙ্কা, তেল, নুন, ডিম দিয়ে মেখে ভাত দিয়ে খান। সবজি কেনার পর উষ্ণ জলে ভাল করে ধুয়ে নিন। কৃষকদের মধ্যে করোনা–‌সংক্রমণের কোনও তথ্য না থাকলেও সাবধান থাকা দরকার। 

 

প্রত্যেকে মাস্ক ব্যবহার করুন। কিনতে না পারলে নিজেই গেঞ্জির কাপড় দিয়ে বানিয়ে নিন। বাইরে বেরোলে মাস্ক পরা উচিত। সব সময় পরতে লজ্জা লাগলেও আমি পরি।’‌
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌হাসপাতালে কেউ সরাসরি কোনও সাহায্য পাঠাবেন না। সব সময় সরঞ্জাম নিয়ম মেনে জীবাণুমুক্ত করা হয় না। যথাযথ পদ্ধতি মেনে তৈরিও হয় না। তাই ত্রাণ সরকারের মাধ্যমেই দিতে হবে‌।’‌
এদিনও মুখ্যমন্ত্রী চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি দমকল–‌কর্মীদেরও ধন্যবাদ দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমকে সদর্থক সংবাদ পরিবেশনে জোর দিতে বলেছেন। তিনি জানান, ‘‌পুলিশকর্মীরা প্রতিদিন রক্ত দিচ্ছেন। রক্তের ঘাটতি মিটছে। তঁাদের অবদান অনস্বীকার্য।’‌
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌করোনা নতুন রোগ। তাই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ম্যালেরিয়া যখন এ রাজ্যে প্রথম থাবা বসিয়েছিল, তখন আক্রান্ত অনেক বেশি ছিল। মৃত্যুর হারও বেশি ছিল। ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ডেঙ্গির ক্ষেত্রেও তাই।’‌ তঁার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে ম্যালেরিয়া–‌আক্রান্ত হয়েছিল ২৭ হাজার ৫৩১, মারা গিয়েছিলেন ৪ জন। ১৯৯২ সালে তা বেড়ে ৪৯ হাজার ১৩০ জন হল। মারা যান ৪৩ জন। ২০১৯ সালে ম্যালেরিয়া–‌আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়ে হয় ১৮ হাজার ৫২৮ জন। মারা যান ৩ জন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, এত দিন সময় লেগেছে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গিকে নিয়ন্ত্রণ করতে। এ বছরেও পঞ্চায়েত, পুরসভাগুলিকে ডেঙ্গি নিয়ে সতর্ক হতে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুর–‌সচিব সুব্রত গুপ্ত এবং স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিক শরদ দ্বিবেদীকে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top