চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়,পূর্বস্থলী: ধূম লেগেছে ‘তাঁতমহলে’। পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলীর দু’‌টি ব্লকের লাখ তিনেক মানুষের রুটিরুজি হল তাঁত। উৎসব মরশুমের মুখে জেলা, রাজ্য, ভিনরাজ্যের বরাত সামাল দিতে ঘুম ছোটে তাঁতশিল্পী–শ্রমিকদের। সেই ছবিরই দেখা মিলল পূর্বস্থলী, সমুদ্রগড়, ডাঙাপাড়া, নসরৎপুর, শ্রীরামপুর প্রভৃতি এলাকায়।
নাওয়া–খাওয়া ভুলে তাঁতিরা খটখটিয়ে বুনছেন টাঙ্গাইল, বালুচরি, তসর, জামদানি, ধনেখালি, ডবল পাড়ের শাড়ি। তাঁতিবউরা সুতো পাকাচ্ছেন, সুতোয় রং লাগাচ্ছেন, উঠোনে সুতো মেলে চড়া রোদের প্রার্থনা করছেন। তবে কিছুটা হলেও এই এলাকার তাঁতের একচ্ছত্র আধিপত্যে থাবা বসিয়েছে পাওয়ারলুমে উৎপাদিত তাঁতবস্ত্র সম্ভার। তাঁত ব্যবসায়ী বাসুদেব বসাক, সুশীল বসাকরা বলছিলেন, ‘হস্তচালিত তাঁতে একটা শাড়ি বুনতে সময় লাগে দু’‌দিন। পাওয়ারলুমে সেখানে দিনে দুটো শাড়ি বোনা যায়। তাই হস্তচালিত তাঁতে মজুরি বেশি পড়ে। নকশায় বৈচিত্র্য থাকে কম। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো বাংলাদেশি সস্তা হ্যান্ডলুম শাড়িতে এখন বাজার ছেয়ে গেছে।’
শ্রমিকের সমস্যাও এখানে প্রকট। আগে উত্তরবঙ্গ প্রচুর শ্রমিক এখানে এসে তাঁতের কাজ করতেন। কয়েকবছর ধরে সেই স্রোতে ভাটা। সমস্যার সুলুকসন্ধানে আরও যে সমস্ত তথ্য মিলল, সেগুলি হচ্ছে, সাবেক নকশায় আর ক্রেতাসাধারণকে টানা যাচ্ছে না। এলাকার উঠতি প্রজন্ম ইদানিং আর তাঁত ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। দাম বেড়েই চলেছে রং, সুতো–সহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের। মোটামুটি মানের একটা শাড়ির দাম আটশো থেকে হাজার টাকা না মিললে লাভ হয় না। আর বাজারে এর থেকে অনেক কম দামের শাড়ি মিলছে। বাংলাদেশি পাওয়ারলুম শাড়ি অনেক হাল্কা। অনেকটাই নজরকাড়া। এর উপর ই–বিলিং, জিএসটি–র কোপের জেরে অনেক তাঁত ব্যবসায়ী সরকারি মেলায় স্টল দিতে চান না। সব মিলিয়ে কিছুটা হতাশা ‘তাঁতমহলে’।
তবে পাশে দাঁড়িয়েছে রাজ্য সরকার। তন্তুশ্রী পুজোর জন্য এখান থেকে শাড়ি কিনছে। বন্যা–সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিলি করার জন্য এখান থেকেই শাড়ি–সহ বিভিন্ন বস্ত্র কিনছে সরকার। জামদানি বা টাঙ্গাইল কাজের বিছানার চাদরের চাহিদা রয়েছে বিদেশে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরিতে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। 
এলাকার বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ বললেন, ‘বামফ্রন্টের আমলে কোনও সরকারি সাহায্য না মেলায় এই এলাকার তাঁতশিল্প রুগ্ন হয়ে পড়ে। মমতা ব্যানার্জির সরকার পাশে দাঁড়ানোয় তাঁতহীন তন্তুবায়দের তাঁতযন্ত্র–সহ নানান সহযোগিতা দেওয়ায় এখন তাঁতিদের মুখে হাসি ফুটেছে।’‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top