প্রচেত গুপ্ত: বুলবুল ঝড় বয়ে গেল। এই রাজ্যে ১১ জনের প্রাণ গেল। ১০ লক্ষ মানুষের ক্ষতি হল। খেতের পর খেতে নষ্ট হল ফসল, সবজি। ঘরবাড়ি যে কত ভাঙল তার ঠিক নেই। মঙ্গলবার পর্যন্ত পাওয়া খবরে সাগদ্বীপ, নামখানা, হিঙ্গলগঞ্জ, গোসাবা, পাথরপ্রতিমা, সন্দেশখালির মতো বহু এলাকায় এখনও গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে রয়েছে। দরিদ্র মৎস্যজীবী, কৃষিজীবীদের করুণ অবস্থা। ত্রাণ, পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ চলছে। বিশাল ক্ষত সারতে সময় লাগবে। যাদের প্রাণ গেছে, তাদের পরিবারের সদস্যরা তো কোনওদিনই আঘাত সামলে উঠতে পারবেন না। ‘‌বুলবুল’ ঝড় শুধু তাদের ঘরবাড়ি, খেতের ফসল‌ লন্ডভন্ড করেনি, তাদের বাকি জীবনটাও লন্ডভন্ড করেছে।
আবহাওয়া বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে ভয়ঙ্কর ঝড়ের খবর আমরা এখন অনেক আগে থেকে পাই। ঝড় কোন পথে চলেছে এবং কোথায়–‌কখন আছড়ে পড়বে জানতে পারি। এবারও পেরেছি। সেই আগাম বার্তা অনুযায়ী সরকার আগে থেকে ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রাণহানি কমানো গেছে। ক্ষতি কমানো গেছে। দু’‌দিন ধরে আবহাওয়া দপ্তর এই খবর টানা জানিয়েছে। সাংবাদিকরা প্রাণপাত পরিশ্রম করে খবরের কাগজ, রেডিও, টিভি, নিউজ পোর্টালে পূর্বাভাষ প্রচারিত করেছেন। (‌এই সুযোগে সাংবাদিকদের প্রশংসা করলাম। যাঁরা সাংবাদিকদের সদা নিন্দায় মুখর, তাঁরা জেনে রাখুন, মানুষের কাছে এই জরুরি বার্তা পৌঁছনোয় তাঁরা কখনও দায়িত্ব পালনে পিছিয়ে থাকেননি, থাকেনও না। প্রবল ঝড়েও তাঁরা পথে নামেন, পথঘাট  জলে ভেসে গেলেও তাঁরা অফিস যান। এটাই তাঁদের পেশা, তাই আমি বাড়তি কোনও হাততালি দিচ্ছি না, কিন্তু প্রাপ্যটুকু তো দিতে হবে)। এছাড়া আবহাওয়া দপ্তর, সরকার, বিপর্যয় মোকাবিলা এজেন্সি, বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষ, ক্লাবের ছেলেরা যে–‌যেমন পেরেছেন মাঠে নেমে কাজ করেছেন, মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েছেন। নিজের জন্য নয়, প্রস্তুতি নিয়েছেন অন্যের ক্ষতি সামলানোর। পুরসভা, পঞ্চায়েত পথে নেমেছিল জোরকদমে। আমি খবর পেয়েছি, দু’‌দিন আগে থেকে কলকাতা পুলিশ যতটা পেরেছে রাস্তায় টাঙানো হোর্ডিং, ফ্লেক্স সরিয়েছে। ঝড়ের সময় এগুলো ভয়ঙ্কর হয়ে যায়। দড়ি, তার ছিঁড়ে উড়তে থাকে।
এই পর্যন্ত পড়ে কেউ যদি ভাবেন আমি সরকারের গুণকীর্তন করতে বসেছি, তাহলে তিনি ভুল ভাবছেন। তুণমূল সরকার বিপর্যয় মোকাবিলায় এবার যে ভাল কাজ করেছে, তার জন্য প্রশংসা তো করবই।‍‌ বেশ করব। হাজারবার করব। ফণী ঝড়ের সময় ওডিশার নবীন পট্টনায়কের সরকার দারুণ কাজ করেছিল। প্রাণহানি যেভাবে ঠেকিয়েছিল, তা ভাবা যায় না। সারা বিশ্ব প্রশংসা করেছে। আমিও লিখেছিলাম। নবীন পট্টনায়ক কি তৃণমূলের কেউ?‌ আবার ১৯৭৮ সালে এই রাজ্যে সিপিএম যেভাবে বন্যাত্রাণে ঝঁাপিয়ে পড়েছিল, সেটা একটা ‘‌মডেল’‌ হতে পারে। তখন তো আবহাওয়া বিজ্ঞান এতটা উন্নত ছিল না। বিপদ আসছে আগে থেকে বোঝাও যেত না। সে বছর ভয়ঙ্কর বন্যা হয়েছিল। সিপিএম সরকার এবং তার সংগঠন জানপ্রাণ লড়িয়ে দিয়েছিল। একথা একশোবার বলব।
বিপর্যয় মোকাবিলায় রাজনীতি করাটা ঠিক নয়। সবাইকে হাত মিলিয়ে বিপদে পড়া মানুষের পাশে যেতে হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের দেশে রাজনীতি হয়। সরকার ভাল করলেও বিরোধীরা পাশে দঁাড়াতে পারে না। তার মানে বলছি না, সমালোচনা থাকবে না, কোথাও ত্রাণ না গেলে বিরোধীপক্ষ বলবে না। অবশ্যই বলবে। চেঁচামেচি করবে। সরকারের গাফিলতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে। তাতে সরকার মুখে যাই বলুক, নড়েচড়ে বসে। তবে এই বিরোধিতা একটা সীমা মেনে করা উচিত। বিক্ষোভে, প্রতিবাদে ক্ষতিগ্রস্তরা যেন ত্রাণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হন। কোনও কোনও সময় বন্যাক্লিষ্ট এলাকায় ত্রাণ নিয়ে গিয়ে সরকারি কর্মীরা বাধা পান। অভিযোগ ওঠে ত্রাণ অপ্রতুল। ত্রাণ যে ‘‌অপ্রতুল’‌ হয়, এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ঘরদোর ভেসে যাওয়া, ভেঙে যাওয়ার মতো বিশাল ক্ষতিকে কটা শুকনো চিঁড়ের প্যাকেট দিয়ে কি সামলানো যায়? মানুষ‌ প্রাথমিক ভাবে রেগে যায়। কিন্তু যেটুকু সঙ্গে সঙ্গে প্র‌য়োজন, সেটুকু তো করতে দিতে হবে। সামান্য খাবার, জল না পেলে মানুষগুলো যে মারা যাবে। আগে তো সেটা দিতে হবে। আমি এক সরকারি কর্মচারীকে দেখেছি, শহরে বসে হাততালি দিচ্ছেন এই বলে যে, গ্রামে ত্রাণ নিয়ে গিয়ে সরকারি কর্মীরা বাধা পেয়েছেন। বেশ হয়েছে। এই ভাবেই প্রতিবাদ হওয়া উচিত। কত বড় বদ‌ ভাবুন একবার। নিজে কিন্তু সরকারের ঘর থেকে মাইনেটা সুড়সুড় করে নিয়েছেন কিন্তু। মুখে বলছেন, ‘‌বয়কট করও’‌।
যাই হোক, এবার এখনও তেমন কিছু হয়নি। ঝড়ের সময় সবাই বিপর্যস্তদের জন্য চিন্তিত, উদ্বিগ্ন ছিল। একদল শুধু মেতেছিল অসভ্য উল্লাসে। একদল ‘‌অমানুষ’। এরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়কে নিয়ে রঙ্গ–‌রসিকতা করে টানা ফুর্তি করেছে।‌‌ দয়া করে ‘‌অমানুষ’ বলতে কেউ পশুপাখির কথা ভাববেন না। পশুপাখিরা স্বজাতের কেউ বিপদে পড়লে হইচই করে ওঠে, তাকে রক্ষার চেষ্টা করে। রসিকতা করে না। এইসব সোশ্যাল মিডিয়া ঘঁাটা ‘‌অমানুষ’রা তাদের থেকে অনেক অনেক নিম্নমানের। এবার বুলবুল ঝড়ের সময় তারা যে ধরনের কার্টুন, ছড়া, জোকস ছড়িয়েছে, তাতে কঠিন সাজা হওয়া উচিত। কী সাজা আমি জানি না। তবে দয়া করে কেউ এদের কান ধরে কষে দুটো থাপ্পড় মারবেন না। আইন নিজের হাতে নেবেন না। ঝড়ে বিধ্বস্ত এলাকায় নিয়ে গিয়ে এদের কেউ গণবিচারের ব্যবস্থাও করবেন না। এটাও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। শুধু মুখে দাবি তুলুন, অনেক হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ার নামে এই অসভ্যতা এবার বন্ধ হোক। আমি মরছি, আর কেউ ‘হ্যা হ্যা’‌ করে হাসছে, এটা চলতে পারে না। কারা এই ধরনের রঙ্গ–‌রসিকতা ছড়িয়েছিল তাদের খুঁজে বের করা হোক।‌
শুধু এবারের ঝড় নিয়ে রসিকতা নয়, স্বাধীন মতের নামে একদল সোশ্যাল মিডিয়ার চরম অপব্যবহার করছে। এই অংশের বাড়াবাড়ি চরমে উঠছে। এরা যা খুশি লিখে দিচ্ছে। ব্যক্তিগত রাগ, হিংসে, না পাওয়ার হীনমন্যতা থেকে এরা সোশ্যাল মিডিয়ার মতো জরুরি মাধ্যমকে ব্যবহার করে। এদের জন্য আজ সোশ্যাল মিডিয়াকে কাঠগড়ায় উঠতে হয়েছে। যারা ভদ্রলোক তাদেরও দোষের ভাগীদার হতে হচ্ছে। এত শক্তিশালী একটা মাধ্যমকে অর্থহীন করে দিতে চাইছে এই অসভ্যের দল। এই লেখা পড়ে হয়তো আমাকেও গাল দেবে। দুর্নীতিবাজ, লম্পট, অযোগ্য, দালাল বলবে।‌ এই কটা কথাই ওদের স্টকে রয়েছে। সে বলুক। আমার সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার ভদ্রলোকেরাও আছেন। তাঁরা বই পড়েন, সিনেমা দেখেন, গান শোনেন, সমাজের ঠিক–‌ভুল নিয়ে চিন্তা করেন। সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরেও পরস্পর মিলিত হন। সবাই মিলে ভাল কিছু করার চেষ্টা করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় চমৎকার লেখালিখিও হয়। এরা নকল ‘‌ভদ্রলোক’‌ নন, আসল ভদ্রলোক। দেখবেন, এই সব অসভ্যের দল ফেসবুকে দাপায় বেশি। ওদের  কোনও দায় নেই। আমি  ইচ্ছে করলেই ফেসবুকে লিখতে পারি, আপনি আমার কাছ থেকে ঘু্ষ নিয়েছেন। আপনি না নিলে বলতে পারি, একশো বছর আগে আপনার পূর্বপুরুষ নিয়েছেন। পুরুষ হলে একরকম, নারী হলে আরেকরকম। একে কি স্বাধীনতা বলে?‌
এই অসভ্যতাই এবারের ‘‌বুলবুল’‌ ঝড় নিয়ে রসিকতার করবার অধিকার দিয়েছে। এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু মানুষের ধারাবাহিক অসভ্যতারই ফল। এরা একশোটার মধ্যে পঁচাত্তরটায় পোস্টে ছলে–‌বলে–‌কৌশলে নিজের ঢাক পেটায়। এই ছলের 
মধ্যে অন্যকে ‘‌ভাল’‌ বলাটাও আছে। ‘‌আমি তোমাকে ভাল বলেছি, এবার তুমি আমাকে ভাল বল’‌। কুড়িটায় অন্যের বাপবাপান্ত করে। করে নিজের ধান্দা পূরণ না হওয়ায়। আর চারটেতে কী করে বলব না। সবাই জানে। একটায় প্রতিবাদের কথা বলে। প্রতিবাদের সময় ঘর থেকে বেরোয় না।
সোশ্যাল মিডিয়ার পবিত্রতা, গুরত্ব, প্রতিবাদের ভাষা রক্ষা করতে হল অসভ্যদের  এখনই আইন করে বের করে দিতে হবে। স্বাধীনতার নামে স্বাধীনতাকেই অপমান করছে এরা। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top