চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
কালনা, ১৬ নভেম্বর

সব ক্যামেরা বন্ধ হওয়া ভাল/ সব আলো আজ নিভিয়ে দেওয়া যাক/ তোমায় এমন হারিয়ে ফেলার খবর/ এক্কেবারে মিথ্যে হয়ে যাক। প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো এই শোক–পঙ্‌ক্তিই এখন কালনা–কাটোয়া ২ মহকুমা–সহ গোটা পূর্ব বর্ধমানের সংস্কৃতি জগতের কণ্ঠস্বর। এই জেলার সঙ্গে নানাভাবে নিবিড় যোগ ছিল সৌমিত্রর। তাই তাঁর মতো নক্ষত্রপতনে মুহ্যমান বর্ধমান। ১৯৬৯ সালের ৮ জুলাই ‘কালনা সিনে সোসাইটি’র আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ হয় সৌমিত্রর হাত ধরে। কালনা সিনে সোসাইটির সঙ্গে ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল উদ্বোধক সৌমিত্রর। তাই সোসাইটির সদস্যদের সঙ্গে দেখা হলেই কর্মসূচি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। সংস্থার সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর সৌমিত্রর লেখা শুভেচ্ছাপত্রটি আগলে রেখেছেন সংস্থার সদস্যরা। সংস্থার শতায়ু কামনা করে সেই শুভেচ্ছাপত্রের এক জায়গায় লেখা রয়েছে, ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কিন্তু সেগুলি সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান করে বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন। সেই কঠিন কাজটাই ৫০ বছর ধরে করছে কালনা সিনে সোসাইটি। সংস্থার সম্পাদক সিদ্ধেশ্বর আচার্য বলছিলেন, ‘সত্যজিৎ রায়ের ওপর একটি লেখা চেয়ে মাস দেড়েক আগেও ফোন করেছিলাম ওঁকে। সোসাইটির কাজকর্ম কেমন চলছে খোঁজ নিলেন। খুবই সদাশয় মানুষ ছিলেন।’
২০০১ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় সৌমিত্রকে ডিলিট সম্মান দেয়। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে–বাইরে’ সিনেমার কয়েকটি দৃশ্যের টানা সাত দিন ধরে শুটিং হয় জামালপুরের চকদিঘি গ্রামে। সেই উপলক্ষে সত্যজিৎ রায়, তাঁর স্ত্রী বিজয়া রায়, ছেলে সন্দীপ রায়, সিনেমার মুখ্য অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বাতীলেখা সেনগুপ্তরা জমিদারদের বাগানবাড়িতে ছিলেন। ওই সব বড় বড় মানুষকে দেখতে এলাকার মানুষ রোজই ভিড় জমাত। দিনরাত সেখানে থাকার সুবাদে একটা পালকিবাহকের পার্ট পেয়েছিলাম, এমনটাই বলছিলেন সৌমিত্রর প্রয়াণে মুষড়ে–পড়া সত্তরোর্ধ্ব সত্যজিৎ সেন। ২০০২ সালে কাটোয়ার বহুবচন সংস্থার আবৃত্তি উৎসবের উদ্বোধনে এসে সংস্থার সভাপতি তুষার পণ্ডিতের বক্তৃতা ও শিক্ষক নন্দন সিংহর আবৃত্তির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন এই দেশবন্দিত অভিনেতা। কাটোয়ার শিল্পী তাপস দাসের ভাস্কর্য উপহার দেওয়া হয়েছিল সৌমিত্রকে। সেটি পেয়ে এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে, অনুষ্ঠানের পর তাপসবাবুর সঙ্গে ভাস্কর্য নিয়ে আলোচনা করেন। সৌমিত্রর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কাটোয়া ভাষাসদন কমিটির ডাকে সোমবার আয়োজিত শোকমিছিলে পা মেলান কাটোয়ার একঝাঁক শিল্প ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। সৌমিত্র শেষবার কাটোয়ায় আসেন ২০১৭ সালে, কাটোয়া উৎসবের উদ্বোধন করতে। রাজু ভট্টাচার্য নামে সেই উৎসবের এক উদ্যোক্তা বলছিলেন, ‘উনি আবার আসিব ফিরে কবিতাটি এত ভাল আবৃত্তি করেছিলেন, আজও কানে বাজে।’ ধানসিঁড়ির তীর, রূপসী বাংলা আজ থেকে আবার সৌমিত্রর ফিরে আসার অপেক্ষায়।

জনপ্রিয়

Back To Top