নিরুপম সাহা, হাবড়া: একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর হাবড়ার বালুইগাছিতে অসুস্থ স্ত্রী কাঞ্চন পালকে নিয়ে থাকেন ৭৫ বছরের কানাই পাল। লকডাউনের কারণে স্ত্রীর জরুরি ওষুধ কিছুতেই জোগাড় করতে পারছিলেন না তিনি। এই পরিস্থিতিতে হাবড়ার হিজলপুকুরের বাড়ি থেকে রাতে হাবড়া ১ নম্বরের বিডিও অফিসের হেল্পলাইনে ফোন করলেন কানাইবাবুর মেয়ে মঙ্গলা হালদার। ফোন ধরলেন বিডিও শুভ্র নন্দী। ওই রাতেই দপ্তরের স্বেচ্ছাসেবক পাঠিয়ে ওষুধ কিনে আধ ঘণ্টার মধ্যে কানাইবাবুর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। 
এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। লকডাউন চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিডিও শুভ্রর নেতৃত্বে চালু করা হয় বিশেষ হেল্প লাইন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তা পোস্টও করে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য, লকডাউনের কারণে এলাকায় বসবাসকারী অসুস্থ, বয়স্ক মানুষদের পাশে দাঁড়ানো। শুধু হেল্পলাইন নয়, এই কাজে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিকেও যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি পঞ্চায়েতে ৫ জন করে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের মোবাইল নম্বর সংশ্লিষ্ট গ্রামপঞ্চায়েতের প্রতিটি বাড়িতে দেওয়া হয়েছে। অসহায় বৃদ্ধ–বৃদ্ধা চিকিৎসা সংক্রান্ত কিংবা অতিপ্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়ার জন্য এই নম্বরগুলিতে ফোন করে যাতে সহায়তা পান, তার জন্য এই ব্যবস্থা চালু করেছেন বিডিও। অসুস্থতা সংক্রান্ত সহযোগিতার জন্য সাহায্যপ্রার্থীর সঙ্গে চিকিৎসকের ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলিয়ে দিয়ে সমাধান করে দেওয়া হচ্ছে। 
বিডিও বলেন, ‘‌আমার ব্লকে এমন অনেক বৃদ্ধ–বৃদ্ধা আছেন, যাঁদের ছেলেমেয়ে কাজের সূত্রে অথবা বৈবাহিক সূত্রে বাইরে, এমনকী বিদেশে থাকেন। সেইসব অসহায় মানুষ যাতে নিজেদের অসহায় না ভাবেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের যেন কোনওরকম অসুবিধার মধ্যে পড়তে না হয়, তার জন্য দপ্তরের উদ্যোগে প্রচুর স্বেচ্ছাসেবক, চিকিৎসক, পুলিশকর্মীদের একত্রিত করে আমরা কাজ করছি। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ভিডিও কল করে সরাসরি যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছি। অনেক সময় গুজবও সামলাতে হচ্ছে।’‌
করোনা পর্বের শুরুর দিকে শুভ্রকে নিজের ব্লকের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি সন্ধের পর রাজারহাটের কোয়ারেন্টিনের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছিল‌। আন্তর্জাতিক উড়ানে কলকাতা বিমানবন্দরে নামা যাত্রীদের শারীরিক পরীক্ষা সংক্রান্ত দেখভালের দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। ফলে সেই সময় তাঁকে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। এরপর লকডাউন শুরু হয়ে যাওয়া নিজের ব্লকেই পুরোপুরি আটকে পড়েছেন তিনি। লকডাউন পরিস্থিতিতে যাতে বাজারগুলিতে মানুষ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা করতে পারেন, তার জন্য বাজারগুলিকে ফাঁকা জায়গায় স্থানান্তরিত করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কেনাকাটা হচ্ছে কি না তা দেখতে সাতসকালেই বেরিয়ে পড়ছেন। বিকেলেও আর এক প্রস্থ বাজারগুলিতে হানা দেওয়া। ১১টা নাগাদ অফিসে ফিরে দৈনন্দিন কাজ সেরে দুপুরের দিকে কোথায় কোথায় কোয়ারেন্টিন সেন্টার করা যায়, তার ব্যবস্থা করা। রেশন ব্যবস্থা ঠিকঠাকভাবে চলছে কি না, তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখার কাজ তো রয়েছেই। সব সেরে যখন নিজের কোয়ার্টারে ফিরছেন, তখন বেশ রাত। তারপরও অবশ্য ফোনে সারা রাত যে কোনও প্রয়োজনে তাঁকে পাচ্ছেন এলাকার মানুষ। আর এভাবেই এই কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের ব্লকের ৭টি গ্রামপঞ্চায়েতের ১৬৩টি গ্রাম সংসদের প্রায় ২ লক্ষ মানুষের দেখভালের দায়িত্ব হাসিমুখে সামলাচ্ছেন বিডিও সাহেব।  

জনপ্রিয়

Back To Top