অরূপ বসু
কোনও করোনা–‌রোগীকে বিনা চিকিৎসায় ফেরানো যাবে না। রাজ্যের হেল্‌থ কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি অসীম ব্যানার্জির তৎপরতায় এই নির্দেশ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে পৌঁছে গেছে। হেল্‌থ কমিশন তৈরিই হয়েছে বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নজরদারি করতে। দেশের সরকারি হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসা–‌পরিষেবা হাকিম শেখ মামলার রায় অনুসারে নিয়ন্ত্রিত। জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন, এমন রোগীকে ফেরানো গোটা দেশে সব হাসপাতালের কাছেই বেআইনি। তবু আকছার ফেরায়, কারণ রোগীর পরিবারের লোক এই আইনি বাধ্যবাধকতার ফঁাকটাই জানেন না। যদি জানতেন, তা হলে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু থেকে তঁারা অন্তত কেউই বঞ্চিত হতেন না। তঁাদের ভরসা দেওয়ার মতো নির্দেশ সুপ্রিম কোর্ট অনেক দিন আগেই দিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেই সুরক্ষা–‌কবচের কথা বিপদের সময়ে মনে রাখতে পারেন ক’জন রোগীর আত্মীয় বা নিকটজনেরা, যঁারা তঁাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন!‌
সরশুনায় পুলিশি উদ্যোগে একটি অ্যাম্বুল্যান্স এক বৃদ্ধ দম্পতি ও তঁার অথর্ব সন্তানকে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যায়। বেড না পেয়ে বাড়িতে পৌঁছে তঁারা আত্মহত্যা করেন। আর–‌একটি পরিবার, যাদবপুর অঞ্চলে বাড়ি, নিজেরাই বয়স্ক মহিলাকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে বেড়ান। শেষ পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগে যখন বেড জুটল, অ্যাম্বুল্যান্সে অপেক্ষা করতে করতেই রোগী মারা গেছেন। এর কোনও ক্ষেত্রেই প্রমাণ করা যাবে না, বিভিন্ন হাসপাতাল তঁাদের ফিরিয়ে দিয়েছে। এই প্রমাণপত্র জোগাড় করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে হাকিম শেখ মামলাটা একটু জেনে রাখা দরকার।
১৯৯২ সালের ৮ জুলাই সন্ধ্যায় মথুরাপুর স্টেশনে ট্রেনে উঠতে গিয়ে প্ল্যাটফর্মে ছিটকে পড়েন খেতমজুর হাকিম শেখ। মাথায় প্রবল আঘাত লাগে, যার জন্য নিউরোসার্জারি দরকার। ডায়মন্ড হারবার হাসপাতাল হয়ে এনআরএস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।‌ তখন রাত পৌনে বারোটা। এক্স‌রে হয়। শয্যার অভাবে ভর্তি করা যায় না। ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে ১২টা ‌২০ মিনিটে নিয়ে যাওয়া হয়। শয্যার অভাব সেখানেও। পিজি, বাঙুর ইনস্টিটিউট— সর্বত্র একই অবস্থা। পরদিন দুপুরে ক্যালকাটা হসপিটালে ভর্তি ও সার্জারির পর প্রাণে বেঁচে যান। তঁার হয়ে ছোটাছুটি করে পশ্চিমবঙ্গ খেত মজদুর সমিতি। তারাই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আগরওয়ালের ডিভিশন বেঞ্চে অভিযোগ জানায়। সরকারি আইনজীবী লীনা চক্রবর্তী মোটামুটি স্বীকার করেন। বিচার চলাকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিচারপতি লীলাময় ঘোষের নেতৃত্বে তদন্ত করায়। দেখা যায়, নীলরতনে কম করে দুটি বেড ছিল। ন্যাশনালে রেজিস্টারই খুঁজে পাওয়া যায়নি। অন্যত্র ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসারের কাজে তৎপরতার অভাব ছিল। সুপ্রিম কোর্ট হাকিম শেখকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলে। নির্দেশ দেয়, কোনও রোগীকে জরুরি চিকিৎসা না দিয়ে ফেরানো যাবে না। দরকারে সুস্থ রোগীর বেড বদল করতে হবে। অন্য হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। 
পরবর্তীতে, রুবি হাসপাতালের কাছে দুর্ঘটনাগ্রস্ত এক রোগীকে ওই হাসপাতাল ফিরিয়ে দেয়। সে–‌ক্ষেত্রেও বিপুল ক্ষতিপূরণ–‌সহ আদালত ওই একই কথা বলে। সব হাসপাতালে রোগীকে ফেরানোর সময়ে একজনও কোনও প্রমাণ রাখে না। রোগীর পরিবার একটু বলুক, বেড যে নেই সেটা টিকিটে লিখে দিন!‌ ডাক্তার পুরো নাম ও স্বাক্ষর করতে বাধ্য। সেটাই করেন না।
বেসরকারি হাসপাতাল কয়েক লক্ষ টাকা আগাম জমা রাখতে বলে। জরুরি চিকিৎসা টাকার জন্য ফেলে রাখতে পারে না। বড়জোর ডিসচার্জের সময় পেশেন্ট আটকে রেখে চাপ দিতে পারে। তা ছাড়া কলকাতার ইএম বাইপাস ধরে যত বড় বড় হাসপাতাল, তারা প্রায় সবাই বিনামূল্যে বা খুব অল্প মূল্যে সরকারের কাছ থেকে জমি পেয়েছে। পরিকাঠামোগত নানা রকম সুযোগ–‌সুবিধে পেয়েছে। তখন অন্যতম শর্ত বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া শর্তই ছিল, সরকারি হাসপাতাল রেফার করলে কিংবা সেখানে জায়গা না পেয়ে কোনও রোগী এলে তঁাকে কম খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। সে–‌কথা ভেবেই তো বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতালকে এখন সরকারি হেল্‌থ স্কিমের আওতায় রাখা হয়েছে। তা থেকে ভালই ব্যবসা পায় এই হাসপাতালগুলো। তবুও এই করোনা–সঙ্কটে এদের কিছু হাসপাতালের ভূমিকা নিন্দনীয়। স্বাস্থ্য কমিশনের নির্দেশে অবশ্য এদের কয়েকটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গত এপ্রিলেই এক নামী বেসরকারি হাসপাতালের এক তরুণ দম্পতি বলেছিলেন, ‘‌ভয় পাচ্ছি। আমাদের কুড়ি লক্ষ টাকার মেডিক্লেম। এ যা দেখছি, তাতেও কিছু হবে না। নাম লিখবেন না প্লিজ, এদের হাত কিন্তু খুব লম্বা!‌’‌
যা–‌ই হোক, আইন ও বিধির কথা তুললে মুখের ওপর হাসপাতালের দরজা বন্ধ করে দিতে কিন্তু সবাই ভয় পায়!‌

জনপ্রিয়

Back To Top