বিভাস ভট্টাচার্য: বেঁধে রাখা হচ্ছে শিকল দিয়ে। শরীরের নানা জায়গায় দেওয়া হচ্ছে তীক্ষ্ণ অঙ্কুশের খোঁচা। পর্যটনের জন্য তৈরি করতে এভাবেই অত্যাচার করা হচ্ছে হাতিদের ওপর। পরবর্তীতে এই হাতিদের কাজে লাগানো হয় পর্যটকদের সওয়ারি বওয়া–সহ তাঁদের মনোরঞ্জনের নানা কাজে। বন্দি হাতিদের ওপর এই অত্যাচারের ভিডিও চিত্র, যা পরিচিত ‘‌দ্য ক্রাশ’‌ নামে প্রকাশ করেছে ওয়ার্ল্ড অ্যানিমাল প্রোটেকশন। থাইল্যান্ড থেকে ভারত, অত্যাচারের চিত্রটা কিন্তু সব জায়গাতেই এক।
সংস্থার অভিযোগ, থাইল্যান্ডে যেখানে পর্যটনের জন্য ২৮০০ বন্দি হাতিকে অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে, তেমনি ভারতে ১০০–রও বেশি হাতি যাদেরকে রাজস্থানের জয়পুরের আজমের দুর্গে সওয়ারি বওয়ার আগে এই ধরনের নিষ্ঠুর ‌প্রশিক্ষণ সহ্য করতে হয়েছে। অধিকাংশ হাতিকেই জঙ্গল থেকে ধরে আনা হয়েছে। অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে এই হাতিদের সওয়ারি বওয়া থেকে পর্যটনের অন্য কাজ করতে বাধ্য করা হয়। যেহেতু পর্যটকেরাও হাতি পছন্দ করেন, ফলে প্রশিক্ষকেরাও বাধ্য হয়ে হাতিদের এভাবে প্রশিক্ষণ দেন। 
ভিডিওর দৃশ্য খুবই বেদনাদায়ক। দেখা যাচ্ছে, ৮টি অল্পবয়স্ক হাতিকে জোর করে তাদের মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে কাঠের কাঠামোতে বেঁধে অবিরাম মারধর করা হচ্ছে। শিকলে বাঁধা এই হাতিদের হাঁটতে হচ্ছে কষ্ট করে। হাঁটতে হচ্ছে ব্যস্ত হাইওয়ে ধরে। শোনা যাচ্ছে রাস্তায় গাড়িঘোড়ার কানফাটানো আওয়াজ। মায়ের কাছছাড়া এই হাতিরা হয়ে পড়েছে আতঙ্কিত। করোনা পরিস্থিতিতে বন্ধ থাকা পর্যটনের জন্য বহু হাতিকেই ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের আসল মালিকের কাছে। আর এই হাতিদের ফিরতে গিয়ে হাঁটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল পথ। আবার কিছু হাতি তাদের পালকদের তত্ত্বাবধানে নিজেরাও এদিক–ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। 
এখনকার এই কঠিন পরিস্থিতিতে এগিয়ে এসে ওয়ার্ল্ড অ্যানিমাল প্রোটেকশনের তরফে এশিয়াতে ১৩টি হাতি দেখাশোনার শিবিরকে আর্থিক সাহায্য করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে বন্দি হাতিদের প্রজনন যাতে না ঘটে সে বিষয়েও সওয়াল করা হচ্ছে। যার উদ্দেশ্য, পরবর্তী প্রজন্মের হাতিরা যাতে এই আতঙ্কের মুখোমুখি না হয়। অত্যাচার বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে পর্যটকদেরও। পিঠে চড়ার পরিবর্তে এই হাতিরা যাতে জঙ্গলে তাদের নিজেদের জায়গায় থাকতে পারে সে–বিষয়ে উদ্যোগী হওয়ার সঙ্গে এই শিবিরগুলির সহায়তাতেও এগিয়ে আসতে হবে। সব হাতিকে জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না হলেও শিবিরগুলিকে কিন্তু সহায়তা করা যেতেই পারে। 
শিবিরে স্থানীয় বা মাহুতদের অর্থ উপার্জনের জন্য কাজের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে সওয়ারি বহন না করে বা সারাদিন রোদে না বাঁধা থেকে হাতিরা নিজেদের মতো চড়ে বেড়াতে পারে। ওয়ার্ল্ড অ্যানিমাল প্রোটেকশনের বন্যপ্রাণ প্রধান অড্রে মিলিয়া বলেন, বন্যজন্তু ও আমাদের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আমরা একটা সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি। এই সমাজবদ্ধ ও বুদ্ধিমান জন্তুরা দীর্ঘদিন ধরে একটা নিষ্ঠুর ব্যবসার শিকার হয়ে চলেছে। যার ফলে বাচ্চা হাতিরা তাদের মা এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। জঙ্গলে মা হাতি তার মেয়ে এবং তার বাচ্চাদের সঙ্গে গোটা জীবনটাই কাটায়। অথচ পর্যটকদের আনন্দ দিতে তাদের কাটাতে হচ্ছে কষ্ট ও দুর্দশার জীবন। 
এ বিষয়ে ভারত সরকারের প্রতি তাদের আবেদন, পশুদের ‌রক্ষার‌ জন্য যে আইন আছে তা যেন কঠোরভাবে চালু হয় এবং পশু কেনাবেচা বা তাদের শরীরের অংশ দিয়ে তৈরি পণ্য নিষিদ্ধ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছেও আবেদন জানিয়ে তাঁদের অনুরোধ, তিনি যেন বিশ্ব জুড়ে এই পশু কেনাবেচা বন্ধের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। ওয়ার্ল্ড অ্যানিমাল প্রোটেকশনের দেশীয় অধিকর্তা গজেন্দ্র কে শর্মা বলেন, ভারতে হাতিকে পুজো পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এদের মারধর করে মানুষকে আনন্দ দিতে শেখানো হয়। বন্যদের জায়গা কিন্তু বনেই।  ফাইল ছবি

জনপ্রিয়

Back To Top