চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় 
শান্তিনিকেতন, ৪ জুলাই

করোনার থাবায় পর্যটন–‌নির্ভর বোলপুর–‌শান্তিনিকেতনে অর্থনীতি এমনিতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। তার ওপর পৌষমেলা, বসন্ত উৎসব বন্ধের সিদ্ধান্তে হতাশ বোলপুর–‌শান্তিনিকেতনের মানুষ। তাঁদের বক্তব্য, মেলা ও বসন্ত উৎসব আগের মতোই করা হোক। এই দুটো উৎসব বন্ধ করার সিদ্ধান্তে বিশ্বভারতীর সমালোচনা করেছেন বীরভূম জেলা তৃণমূলের সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলও। 
তাঁর মতে, বসন্ত উৎসব ঘিরে বিশ্বভারতী সমস্যার কথা রাজ্য সরকারকে জানাতেই রাজ্য সরকার সবরকম ব্যবস্থা করেছিল। শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের এবং শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যের কথা মাথায় রেখে। পৌষমেলা বা বসন্ত উৎসব শুধু বিশ্বভারতীর কোনও অনুষ্ঠান নয়, এর সঙ্গে সারা দেশ বিশেষ করে বাংলা ও বাঙালির আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। তিনি অবশ্য এর পিছনে আরএসএসের হাত দেখতে পাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ–‌বিরোধী আরএসএস জীবন থেকে রবীন্দ্রনাথকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে এটা তারই অঙ্গ। শুক্রবার বিশ্বভারতী কর্মসমিতির বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেয়, এবছর পৌষমেলার আয়োজন করবে না বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে পৌষ উৎসবের (৭–৯ পৌষ) যা অনুষ্ঠান হয় তাতে কোনও পরিবর্তন হবে না। একইভাবে এবার দোলের দিন বসন্ত উৎসব বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জানা গিয়েছে, যে কোনও পূর্ণিমার দিন ঘরোয়া ভাবে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করবে বিশ্বভারতী। শুক্রবার শান্তিনিকেতনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসমিতির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে গতকালই জানিয়েছিলেন বিশ্বভারতীর মুখপাত্র অনির্বাণ সরকার। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তকে আশ্রমিক ও প্রাক্তনীদের অনেকেই সর্মথন করলেও তীব্র প্রতিবাদ জানান বোলপুরের ব্যবসায়ীরা। কর্মসমিতির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি পদ্মশ্রী ডঃ সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি অধ্যাপক দুলালচন্দ্র ঘোষ। ২০১৮ সালে পৌষমেলার সময় দূষণ নিয়ে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ কার্যকরী কোনও ভূমিকা নিচ্ছে না বলে পরিবেশ আদালতে মামলা করেছিলেন পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত। আদালতের নির্দেশ পরও ২০১৯ সালে নির্দিষ্ট সময়ের পর ব্যবসায়ীরা মেলার মাঠ থেকে না উঠলে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝামেলা হয়। পরে এক ব্যবসায়ী উপাচার্য, কর্মসচিব–সহ তিনজনের বিরুদ্ধে চুরির মামলা করেন। এমনকী মেলাতে আসা এক গৃহবধূ উপাচার্য ও এক শিক্ষক–সহ পাঁচজন আধিকারিকের বিরুদ্ধে শান্তিনিকেতন থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। এই অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে শান্তিনিকেতন থানার পুলিশ। এরপরই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মেলা পরিচালনা না করার কথা বলে ছিলেন উপাচার্য। তাতেই সিলমোহর পড়েছে কর্মসমিতির বৈঠকে।
এপ্রসঙ্গে বোলপুর ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষে সুনীল সিং এবং সুব্রত ভকত বলেন, ‌‘‌রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌষমেলা বা বসন্ত উৎসব এখন শুধু বিশ্বভারতীর নয়, সারা দেশের অনুষ্ঠান। এটাকে এই ভাবে বন্ধ করে দেওয়া যায় না। বিশ্বভারতীর প্রাক্তন জনসংযোগ আধিকারিক অমিতাভ চৌধুরির বক্তব্য, সম্প্রতিকালে পৌষমেলা ও বসন্ত উৎসবকে ঘিরে যে ধরনের ভিড় ও বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল তাতে বিশ্বভারতীর একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া হয়তো উপায় ছিল না। উল্টো দিকে মেলা, বসন্ত উৎসব বোলপুর–‌শান্তিনিকেতনের মানুষের কাছে বড় আবেগের জায়গা। সেটা বন্ধ হলে কষ্টের। ভুবনডাঙার শেফালি হাজরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন এই দুটো উৎসবের জন্য, তাঁর মতোই ছোট ছোট হস্তশিল্পীরা হাতের কাজ বিক্রি করে সারা বছর সংসার চালান। মেলা বন্ধের সিদ্ধান্তে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই আঘাত লেগেছে সকলের। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top