অমিতাভ বিশ্বাস
তেহট্ট, ১৫ নভেম্বর

কফিনবন্দি দেহ ফিরতেই চোখের জলে ভাসল গ্রাম। শেষ দেখা দেখতে রবিবার সন্ধে থেকেই ভিড় জমেছিল রঘুনাথপুরের শহিদ সুবোধ ঘোষের বাড়িতে। তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে স্থানীয় নিমতলা বিদ্যানিকেতনের মাঠে মঞ্চ করা হয়েছিল, সেখানেই মরদেহ এনে রাখা হয়। প্রশাসনের আধিকারিক–সহ রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁকে গান–স্যালুট দেওয়া হয়। 
শুক্রবার পাকিস্তানি সেনার গুলিতে বারমুলা সেক্টরে সুবোধ ঘোষ (‌২৪)‌ প্রাণ হারান। রবিবার সুবোধের কফিনবন্দি দেহ আসার খবরে সকাল থেকেই বাড়ি ও মাঠে ভিড় জমিয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। এদিন সন্ধে থেকেই মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশি তৎপরতা দেখা যায়। সুবোধ যে স্কুলে লেখাপড়া করেছেন, সেই নিমতলা বিদ্যানিকেতনের মাঠেই তাঁর মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্কুলের মাঠ ছাড়াও সুবোধের বাড়ির সামনেও একটি মঞ্চ করা হয়েছিল। এদিন এই পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন পুলওয়ামার শহিদ সুদীপ বিশ্বাসের বাবা, মা ও বোন।
পাক গুলি কে‌ড়ে নিয়েছে ভাইফোঁটার আনন্দ। শোকের স্মৃতিতে আচ্ছন্ন কাশ্মীরে গুলিতে নিহত সামরিক জওয়ান সুবোধ ঘোষের বোন। ভাইফোঁটা দেওয়া আর হল না তাঁর। পরিবর্তে দাদার ছবি বুকে আঁকড়ে দু’‌চোখ ভেজাতে হল তাঁকে। সোমবার ভাইফোঁটা, কিন্তু তার আগে সুবোধ ঘোষের কফিনবন্দি দেহ ফিরল বাড়িতে, যে কারণে শোকের ছায়া নেমেছে গোটা রঘুনাথপুর গ্রামে। ৬ বছর আগে বিনোদনগরে বিয়ে হয় সুবোধের বোন পলির ঘোষের। বিয়েতে আনন্দ করেছিলেন সুবোধ। পলি জানিয়েছেন, বিয়ের পর একবার দাদাকে ভাইফোঁটা দিতে পেরেছিলেন। পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন সুবোধ। ৪ বছরের চাকরিতে ভাইফোঁটায় আসতে পারেননি। যে কারণে ফোঁটা দেওয়ার পাশাপাশি দাদার আশীর্বাদ নেওয়াও হয়নি বোনের। শুক্রবার পাকিস্তানি গুলিতে সুবোধের মৃত্যুর খবর পেয়ে রঘুনাথপুরে গ্রামের বাড়িতে ছুটে আসেন পলি। প্রশাসন থেকে নানা রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীরা বাড়িতে এসে আশ্বস্ত করলেও বোনের মন মানতে চায়নি। রবিবার সকালে চোখের কোনায় জল নিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললেন, দাদা চাকরি পাওয়ার পর থেকে একবারও ভাইফোঁটা দেওয়া হয়নি। সেদিন ফোনে কথা হয়েছে। তবে ছুটিতে বাড়িতে এলেই আমার জন্য মিষ্টি, উপহার নিয়ে আসত। কোনওবার এর ব্যাতিক্রম হয়নি। বছরের শেষে আসার কথা ছিল দাদার। দাদার মেয়ের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে আনন্দ করার কথা বলেছিল। কিন্তু কীভাবে কী হয়ে গেল, এখনও বুঝতে পারছি না। 
সুবোধের পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ৪ বছর ধরে সুবোধ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। জুলাই মাসে বাড়িতে আসেন ৪০ দিনের জন্য। কিন্তু বাড়ি ফিরেও বেশি দিন পরিবারের সঙ্গে কাটাতে পারেননি। করোনা–কালে ছুটির অর্ধেক দিন কাটাতে হয়েছিল নিভৃতবাসে। তবুও ছুটি বাড়ানোর চেষ্টা করলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তা মানেননি। বাধ্য হয়ে কর্মস্থলে যেতে হয়েছিল সুবোধকে। আরও জানা গেছে, গত বছর বিয়ে করেন সুবোধ। রয়েছে তিন মাসের একটি কন্যাসন্তান। রঘুনাথপুর গ্রামের মানুষজন প্রত্যেকেই ভালবাসতেন তাঁকে। গ্রামের ছেলের এই ঘটনায় পরিবারের পাশাপাশি গোটা গ্রামে দীপাবলির আনন্দটা যেন ফিকে হয়ে গেল। 

জনপ্রিয়

Back To Top