‌আজকালের প্রতিবেদন: ভাষা শেখানো যায় না। ভাষার আলো মনে জ্বালাতে হয়—‌ এক প্রসঙ্গে  বলেছিলেন আমেরিকান দার্শনিক ও ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি। আমাদের দেশের দিকে তাকালে, বহু ভাষাভাষীর এই ভারতকে বলা হয়, ‘‌লার্জেস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাবরেটরি’‌। যেখানে দেড় হাজারের থেকেও বেশি ভাষায় মানুষ কথা বলে। ভাষাই মানুষের মনে আলো জ্বালাতে সাহায্য করে, মানুষে মানুষে বন্ধন অটুট করে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল পড়ুয়াদের কাছে। মাতৃভাষার শ্রেষ্ঠ উৎসবের দিনেই পথ চলা শুরু হল ইন্টারন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলের। বিশ্ববিদ্যালয়েই আপাতত পড়ানো হবে ৭টি বিদেশি ভাষা। সেগুলি হল–‌ ইংরেজি, এসপেরান্তো, জার্মানি, ফরাসি, স্প্যানিশ, চাইনিজ এবং জাপানি‌। এই উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার হলে বসেছিল চাঁদের হাট। বরেণ্য শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে বিদেশি ভাষা শেখানোর বিশেষজ্ঞরাও ছিলেন। আর ছিল একঝাঁক পড়ুয়া। অনুষ্ঠানে সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর সত্যম রায়চৌধুরী ভাষণে বলেন, ‘‌আমরা বাঙালিরা ভাষা নিয়ে আবেগপ্রবণ, স্পর্শকাতর। আজ মাতৃভাষা দিবস। সারা পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তেই বাঙালিরা রয়েছেন। লন্ডন, নিউইয়র্কে প্রচুর বাঙালি আছেন। পথে ঘাটে তাঁরা বাংলায় কথা বলেন। বাংলাকে ভাল না বাসলে এত মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন কেন?‌ অনেকে বলেন হিন্দি বা বিদেশি ভাষার চাপে বাংলা ভাষা চাপা পড়ে যাচ্ছে। আমি তা বিশ্বাস করি না। আমি বাঙালি হিসেবে গর্বিত। যে নিজের ভাষাকে ভালবাসে, সে সব ভাষাকেই ভালবাসবে।’‌
জার্মানির কনসাল জেনারেল মাইকেল ফেনার সত্যম রায়চৌধুরীর কথার সূত্র ধরেই বললেন, ‘‌আচার্য একটা দারুণ কথা বলেছেন, মায়ের ভাষাকে ভালবাসলে সব ভাষাকে ভালবাসা যায়। নতুন ভাষা শিক্ষার অর্থ চাকরি, পড়াশোনা ও সংস্কৃতি চিনতে সাহায্য করে। নতুন বন্ধুও পাওয়া যায়।’
আলিয়ঁজ ফ্রঁসের অধিকর্তা ফেব্রিক প্লাঁসো বলেন, ‘‌বেশিরভাগ মানুষ পৃথিবীতে বহু ভাষাভাষীর এলাকাতেই বসবাস করেন। আমিও জার্মানিতে ৫ বছর ছিলাম। ভাষা শিক্ষা মনের আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে।’‌
বিশিষ্ট অধ্যাপক চিন্ময় গুহ তাঁর ভাষণে ভাষা শিক্ষার বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ‘‌চারপাশে ঘনায়মান অন্ধকারে কেউ যেন প্রদীপ তুলে দিচ্ছে। নতুন জীবনের সন্ধান দিচ্ছে। ভাষা শেখা মানে অন্যকে সম্মান করা।’‌ এই প্রসঙ্গে তিনি আলব্যেয়র কামুর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘‌আমরা বন্ধন তৈরি করছি।’‌ আসলে ভাষা শিক্ষা মানে মানুষে মানুষে বন্ধন তৈরি করা।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের পূর্ব ও উত্তর–‌পূর্ব ভারতের অধিকর্তা দেবাঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘‌ছোটবেলা থেকেই আমি ৩টি ভাষা শিখেই বড় হয়েছি। স্কুলে ইংরেজি, বাড়িতে বাংলা আর বাইরের জগতে হিন্দি। যত বেশি ভাষা শেখা যাবে, ভাবনাকে সমৃদ্ধ করবে।’‌ বাংলা ভাষার প্রসঙ্গে ভগিনী নিবেদিতার কথা বলে দেবাঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘‌নিবেদিতা স্কুলে অঙ্ক শেখাতেন। সেখানে একবার তিনি বলেছিলেন, তোমরা যে ‘‌লাইন’‌ শব্দটা বল এর বাংলা কী?‌ পড়ুয়া উত্তর দিয়েছিল রেখা। নিবেদিতা বলেছিলেন খুব মিষ্টি শব্দ।’‌
এদিন উপস্থিত ছিলেন সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়, বিশিষ্ট শিক্ষক সুবীর ধর।‌‌

‌প্রদীপ জ্বালিয়ে সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটিতে স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ–‌এর উদ্বোধন করছেন এসএনইউ–‌এর আচার্য সত্যম রায়চৌধুরী। বাঁ দিক থেকে আছেন জার্মানির কনসাল জেনারেল মাইকেল ফেনার, অধ্যাপক চিন্ময় গুহ, সত্যম রায়চৌধুরী,  আলিয়ঁস ফ্রঁসের অধিকর্তা  ফেব্রিস প্লাকঁ। অধ্যাপক সুবীর ধর ও এসএনইউ–‌এর উপাচার্য ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়। নিউ টাউনে। শুক্রবার। ছবি:‌ শিখর কর্মকার‌

জনপ্রিয়

Back To Top