‌চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, কালনা: সিরিয়াল কিলার কামরুজ্জামান সরকারের অপরাধের প্রমাণ জোরাল করতে পুলিশের প্রধান ভরসা নিহত ও আক্রান্ত মহিলার বাড়ির আসবাব। পুলিশ মনে করছে, আক্রমণ হলে প্রতিরোধ হবেই। তার ওপর আততায়ীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন ও লুঠপাটের অভিযোগ থাকায় ধ্বস্তাধ্বস্তি বা আততায়ীর কুকর্মের ছাপ থাকবেই। পুলিশ আরও মনে করছে, ঘটনা ঘটার পর ঘরে এলাকার লোকজনের ঘন ঘন যাতায়াতের ফলে দরজা–জানলা–মেঝেয় অভিযুক্তর শরীরের ছাপ মুছে গেলেও তক্তাপোষ, আলমারি, আয়না বা বিভিন্ন আসবাবপত্র থেকে দাগ চট করে মুছবে না। কারণ লুঠপাট করতে গেলে আলমারি খুলতে হবে বা খাটের তলা খুঁজতে হবে। 
তাই ভবানী ভবন থেকে ফিঙ্গার প্রিন্ট বিশেষজ্ঞরা এসে ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরের মধ্যে থাকা বিভিন্ন জিনিসের নমুনা সংগ্রহ করছেন। ঘরের বিভিন্ন অংশের ছবি তুলছেন। পূর্ব বর্ধমানের পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখার্জি বলেন, ‘কালনা ও মন্তেশ্বরের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষজ্ঞরা গিয়ে পরীক্ষা করছেন। নমুনা সংগ্রহ করছেন। অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহে এগুলি গুরুত্বপূর্ণ।’ 
এসবের সঙ্গে পুলিশ খুনের পদ্ধতি জানতে কামরুজ্জামানকে নানাভাবে জেরা করছে। জেরায় পুলিশ জানতে পেরেছে, শুরুর দিকে কামরুজ্জামান নিঃসঙ্গ মহিলাদের খুন করার জন্য চেনই ব্যবহার করত। চেন গলায় পেঁচানোর সময় যাতে পিছলে না যায়, তার জন্য চেনটি রবারের টিউবের আবরণ দিয়ে নিত। কিন্তু তাতেও মাঝেমাঝে ব্যর্থ হচ্ছিল কামরুজ্জামান। তাই মৃত্যু নিশ্চিত করতেই লোহার রড সঙ্গে নিত। শ্বাসরোধ আর মাথায় ভারী বস্তুর আঘাত, দুটো কাজ একসঙ্গে করে মৃত্যু নিশ্চিত করত কামরুজ্জামান। খুন করার জন্য দুপুরবেলাটা বেছে নিত। কারণ, ওই সময় সাধারণত পুরুষ বাড়িতে থাকেন না। গত এপ্রিল ও মে দুই মাসে যে চারটি খুন হয়েছে, সবকটি খুনই হয়েছে দুপুরবেলায়। পুলিশের জেরায় কামরুজ্জামান প্রত্যেকটি ঘটনাস্থলের এত নিখুঁত বিবরণ দিচ্ছে যে, চমকে উঠছে পুলিশ। অর্থাৎ প্রতিটি ‘অপারেশনে’র আগে বহুবার এলাকায় রেইকি করত। যাতে শিকার কোনওভাবেই ফসকে না যায়। আর পুরো ‘অপারেশনটা’ দ্রুত ও পরিকল্পনামাফিক করা যায়। পুলিশ ডায়েরি থেকে দেখা যাচ্ছে প্রতিটি ঘটনাই ঘটেছে গড়ে ৭ মিনিটে। এছাড়া লোকজনের সন্দেহ দূর করতে সবসময় ধোপধুরস্ত পোশাক পরত কামরুজ্জামান। মাথায় সবসময়ই শোভা পেত হেলমেট। নাদনঘাটের সুজননগরে যেখানে কামরুজ্জামান থাকত, সেখানেও বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। খরচ চালাত লুটের গয়না বিক্রি ও বন্ধক দিয়ে। পুলিশ কয়েকজন বন্ধকের কারবারিকে শনাক্তও করেছে। নিজেকে বেশিরভাগ সময়েই মিটার রিডার হিসেবে নিজের পরিচয় দিত। পুলিশের অন্দরের খবর, কামরুজ্জামান জিঘাংসাকে মিশিয়েছিল মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ সূত্রে। ফলে বারেবারেই পুলিশকে ঘোল খাওয়াতে পারছিল। তবে নিখুঁত পরিকল্পনা করে কামরুজ্জামানকে ধরে শেষমেশ জিত হয়েছে পুলিশেরই।

জনপ্রিয়

Back To Top