নীলাঞ্জনা সান্যাল- রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ফোন করে ভয় দেখাচ্ছেন রাজ্যপাল। গায়ের জোর দেখিয়ে মস্তানসুলভ কথাবার্তা বলছেন তিনি। এই অভিযোগ করে রাজ্যপাল তথা আচার্য জগদীপ ধনকড়ের তীব্র সমালোচনা করলেন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি। তঁার অভিযোগ, রাজ্যপাল নানা ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্মে বাধা দিচ্ছেন। আচার্য পদের সম্মানহানি করছেন। তাঁর আচরণ অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক। উচ্চশিক্ষা দপ্তর আইন এবং বিধি মেনেই কাজ করেছে।
উপাচার্যদের উদ্দেশে জারি–‌করা অন্য একটি নির্দেশিকায় দপ্তরের মাধ্যমে নয়, সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা বলেছেন রাজ্যপাল। নইলে আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়ার ‘‌হুমকি’‌ও দিয়েছেন তিনি। উপাচার্যদের সঙ্গে রাজ্যপালের এহেন আচরণেরও তীব্র সমালোচনা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। ‌এদিকে, এ নিয়ে মঙ্গলবার রাতেই একটি নির্দেশিকা জারি করেন উচ্চশিক্ষা দপ্তরের সচিব মণীশ জৈন। সেখানে এই সংক্রান্ত বিধিটির ৮ নম্বর ধারার ৫ নম্বর উপধারাটি উল্লেখ করে বলেন, এই বিধি অনুযায়ী রাজ্যপাল সরাসরি উপাচার্যদের কোনও নির্দেশ দিতে পারেন না। যোগাযোগ করতে পারেন না। তাঁর কিছু বলার থাকলে উচ্চশিক্ষা দপ্তরের মাধ্যমে জানাতে হবে। দপ্তর মনে করলে সেটা উপাচার্যকে জানাবে। সচিবের এই নির্দেশের পর রাজ্যপালের উপাচার্যদের উদ্দেশে জারি–করা নির্দেশিকার কোনও গুরুত্ব রইল না। ‌
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে রাজ্যপালের। বিশ্ববিদ্যালয়–‌সংক্রান্ত যে আইনটির বিধি গত বছর ডিসেম্বর মাসে বিধানসভায় পাশ হয়েছে, তা উপেক্ষা করেই বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাণিবিদ্যার শিক্ষক গৌতম চন্দ্রকে নিয়োগ করেন রাজ্যপাল। যদিও এই পদে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার শিক্ষক আশিস পাণিগ্রাহীর নাম রাজভবনে পাঠিয়েছিল দপ্তর। তবে রাজ্যপালের পাল্টা নির্দেশকে খারিজ করে সোমবার রাতেই আশিসবাবুকে সহ–উপাচার্য পদে নিয়োগের নির্দেশ জারি করে দপ্তর। এদিন সকালেই তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন।
শিক্ষামন্ত্রী এদিন বলেন, ‘‌আমার ছাত্রজীবন থেকে এখনও পর্যন্ত কখনও শুনিনি রাজ্যপাল নিয়োগপত্র দিচ্ছেন। এই কাজটা উচ্চশিক্ষা দপ্তরের। একটা অসম্ভব ব্যাপার উনি ঘটাতে চাইছেন। যা অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক। রাজ্যপাল হিসেবে আচার্যের যে–‌পদে উনি আছেন, সেই সম্মাননীয় পদের অসম্মান করছেন। পদটিকে নিয়ে ছেলেখেলা করছেন। আমরা এটা কখনওই মানব না। শুধু তা–‌ই নয়, উনি ফোনে উপাচার্যদের ভয় দেখাচ্ছেন। উপাচার্য পরিষদ আমাকে বিষয়টি জানিয়েছে। রাজ্যপাল তাঁদের বলছেন, সাসপেন্ড করে দেব, তোমাকে খতম করে দেব। উপাচার্যরাও সম্মাননীয় ব্যক্তি। তাঁরা এভাবে গায়ের জোর দেখিয়ে, মস্তানসুলভ কথা বললে আমরা ব্যথিত হই। উপাচার্যদের নিয়ে হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপও তৈরি করেছেন।’‌ এ সংক্রান্ত আইন ও বিধির উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘‌এ ক্ষেত্রে যা করা হয়েছে সবটাই এই সংক্রান্ত আইন ও বিধি মেনে। আইনে বলা আছে, সহ–উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে দপ্তরের সুপারিশক্রমে, আলোচনা অনুসারে রাজ্যপাল ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু তিনি তা না করে একটা উড়ো নাম নিয়ে এসে যুক্ত করে দিয়ে বললেন, ইনি সহ–উপাচার্য‍‌!‌ তীব্র ভাষায় তাঁর এই আচরণের নিন্দা করছি। তিনি ইট মারছেন। আমি পাটকেল মারতে চাই না। কিন্তু ইটটা আমার গায়ে লাগছে, এটা বলতে চাই। উনি স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে ঠিক করতে পারেন না কাকে নিয়োগ করা হবে। বেতন দেবে কে!‌‌ বিনয়ের সঙ্গে তাঁকে বলতে চাই, এই ধরনের কাজকর্ম থেকে বিরত থাকুন।’‌ শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘‌রাজ্যপাল প্রথম দিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্মে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চাইছেন। বিতর্কিত পরিবেশ তৈরি করে বাঁচতে চাইছেন। কিন্তু তাঁর এই মনোভাবের কারণে বাংলার শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁকে বলতে চাই, বিধানসভার ওপরে কেউ নয়। সেই বিধানসভায় পাশ–‌হওয়া আইন ও বিধি মেনেই সবটা করা হয়েছে।’‌
২০১৯–‌এর ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন–‌সংক্রান্ত বিধিগুলি বিধানসভায় পাশ হয়। সহ–উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে তাতে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে কোনও সার্চ কমিটি গঠিত হবে না। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে রাজভবন সম্মতি জানাবে। বিধি অনুযায়ী দপ্তরের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় বার একই ব্যক্তির নাম পাঠানো হলে, রাজভবন সেই নামে সম্মতি দিতে বাধ্য। আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে জট তৈরি হলে তা সংশোধনের ক্ষমতা নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বলা আছে। যেমন, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ৫৮ নম্বর ধারায় এটা বলা আছে। তা মেনেই রাজ্যপালের মনোনীত প্রার্থী গৌতম চন্দ্রের নাম খারিজ করে আশিস পাণিগ্রাহীকে সহ–উপাচার্য করা হয়েছে। দপ্তরের আধিকারিকদের অভিযোগ, বার বারই আইনটির ভুল ব্যাখ্যা করছেন রাজ্যপাল।
সোমবারই শিক্ষামন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে ‌বিজেপি–‌‌র লোক বসানোর চেষ্টা করছেন রাজ্যপাল। এদিনও শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘‌উনি যাঁকে নিয়োগপত্র দিয়েছিলেন, তিনি বিজেপি–র অ্যাক্টিভিস্ট।’‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top