আজকালের প্রতিবেদন: এন আর এস হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তার নিগ্রহের প্রতিবাদে আজ, বুধবার রাজ্যের সমস্ত সরকারি–বেসরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ (‌ওপিডি)‌ পরিষেবা, প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ থাকবে। তবে আপৎকালীন পরিষেবা বজায় রাখার চেষ্টা করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। মঙ্গলবার এনআরএস–সহ রাজ্যের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হবু চিকিৎসকেরা কর্মবিরতিতে শামিল হন। বন্ধ ছিল সমস্ত পরিষেবা। মঙ্গলবার তপসিয়ার এক বাসিন্দার মৃত্যু হয় হাসপাতালে। গোটা ঘটনার তদন্ত হবে একজন যুগ্ম নগরপাল পদমর্যাদার অফিসারের নেতৃত্বে। সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত এনআরএসে জুনিয়র ডাক্তাররা ইমার্জেন্সির সামনে অবস্থান বিক্ষোভে বসেন। হাসপাতালের দু’‌দিকের মূল গেট বন্ধ করে তালা লাগিয়ে শাট ডাউন পোস্টার দিয়ে দফায় দফায় চলে বিক্ষোভ। বেলা বাড়লে  এনআরএসে শামিল হন আর জি কর, এসএসকেএমের জুনিয়র ডাক্তাররাও। চিকিৎসক সংগঠনের যৌথ মঞ্চের তরফে ডাঃ অর্জুন দাশগুপ্ত জানান, আজ, বুধবার সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে ওপিডি পরিষেবা। মৃতের পরিবারের ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতরা হল আদিল হারুন, নায়িম খান, মহম্মদ শাহনাওয়াজ আলম, মহম্মদ নিজামুদ্দিন, আফরোজ আলম। 
সোমবার পেটব্যথা, বমি এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা নিয়ে রবিবার এনআরএসে ভর্তি হন ট্যাংরার বাসিন্দা মহম্মদ সাহিদ (‌৮৫)‌। মেল মেডিসিন বিভাগে ৩১ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বিকেলের পর রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। পরিবারের অভিযোগ, বারবার বলা সত্ত্বেও কোনও ডাক্তার আসেননি। অনেকক্ষণ পর এক চিকিৎসক ইঞ্জেকশন দিয়ে যান। খুব একটা লাভ হয়নি। কিছুক্ষণ পর মারা যান। পরিবারের দাবি, ভুল চিকিৎসার ফলেই মৃত্যু হয়েছে। সন্ধে গড়িয়ে গেলেও মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। পরে মৃত্যুসংবাদ জানানো হলে বডি আটকে দেয়। এরপর মৃতের পরিবার ও চিকিৎসকদের মধ্যে বাদানুবাদ চলে। হাসপাতাল চত্বরে মৃতের পরিবারের তরফে কয়েকশো লোক হাজির হন। ইট, বাঁশ, লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। পাল্টা জুনিয়র ডাক্তাররাও মারমুখী হয়ে ওঠেন। ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে ইমার্জেন্সিতে। উভয় পক্ষের মধ্যে সঙ্ঘর্ষ চরম আকার নেয়। ঘটনায় তিন জুনিয়র ডাক্তার আহত হন। তাঁদের মধ্যে একজনের আঘাত গুরুতর। ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পরিবহ মুখার্জি। ডোমজুর থেকে পরিবহর মা–বাবা হাসপাতালে আসেন। ছেলের এই অবস্থায় তাঁরা দু’‌জনেই ভেঙে পড়েছেন। তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যান সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী, বিজেপি নেতা মুকুল রায় ও সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়। তাঁরা সকলেই গোটা ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। একজন জুনিয়র ডাক্তারের পাঁজরে আঘাত লাগলেও তিনি আপাতত স্থিতিশীল। অপর একজন পাটনার বাসিন্দা যশ তেকওয়ানি এনআরএসে সিসিইউ–তে চিকিৎসাধীন। তাঁর মাথা, নাক ও মুখে চোট লাগে। জুনিয়র ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হস্তক্ষেপ দাবি করেন।   
হাসপাতালে নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণ, দোষীদের শাস্তির দাবি, পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে জুনিয়র ডাক্তাররা স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। গেট বন্ধ থাকায় কোনও রোগী ভর্তি হতে পারেননি। পরে অবশ্য রোগীরাই গেটের তালা ভাঙতে থাকেন। কিছুটা গেট খোলা থাকলেও অ্যাম্বুল্যান্সে রোগী আটকে ছিল। ওপিডি–তে টিকিট কাউন্টার, ডায়াগনস্টিক পরিষেবা–সহ সমস্ত কিছু স্তব্ধ ছিল। ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয় রোগীদের। পুরুলিয়া থেকে  শিবানী টুডু তাঁর ৫ বছরের সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন। বলেন, ‘‌এত দূর থেকে এসে শুনছি ডাক্তারবাবু দেখবেন না।’‌ অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ছিলেন মেদিনীপুর থেকে আসা শেখ রফিক আলম। বললেন, ‘‌একদিনের রুজি–রোজগার গেল। কী করব বুঝতে পারছি না।’‌ শুধু এনআরএস নয়, উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল, সাগর দত্ত, মুর্শিদাবাদ, এসএসকেএম, ন্যাশনাল মেডিক্যাল, কলকাতা মেডিক্যাল–সহ সমস্ত মেডিক্যাল কলেজে জুনিয়র ডাক্তাররা কর্মবিরতি করেন। কোথাও ধর্না, কোথাও মৌন মিছিল হয়। এদিন এনআরএস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জুনিয়র ডাক্তারদের বৈঠক হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। স্বাস্থ্য দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য গেলে বিক্ষোভের মুখে পড়েন। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। সমস্ত দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানান। হাসপাতালের সুপার ডাঃ সৌরভ চ্যাটার্জি বলেন, ‘‌মৃতের দেহ ময়নাতদন্ত হয়েছে। মৃত্যুর কারণ জেনে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।’‌ কলকাতা পুলিশের নগরপাল অনুজ শর্মা, স্বাস্থ্য (‌শিক্ষা)‌ অধিকর্তা প্রদীপ মিত্র এসেছিলেন। বৈঠকে জুনিয়র ডাক্তারদের দাবিগুলো শোনা হয়েছে। 

জনপ্রিয়

Back To Top