শিখর কর্মকার: জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি–‌র ধাক্কায় সম্প্রতি অসমের ১৯ লক্ষ মানুষ ‘‌রাষ্ট্রহারা’‌ হয়েছে। আজ তাঁরা উদ্বাস্তু। ভবিষ্যতে তাঁদের ভিটে থাকবে কি না, এই দেশে থাকার অধিকার থাকবে কি না, তা তাঁদের জানা নেই। এনআরসি আতঙ্কে ভুগছেন দেশের অন্য কয়েকটি রাজ্যে বসবাসকারী বহু মানুষ। তাছাড়া পৃথিবীর কোনও না কোনও প্রান্তে প্রতি সময়ে জন্ম নেয় উদ্বাস্তু। নিজের ভিটে, দেশ বদল করে কাঁটাতার পেরিয়ে রাষ্ট্রের পরগাছা হয়ে কোনওরকমে বেঁচে থাকে উদ্বাস্তু হিসাবে চিহ্নিত হওয়া মানুষগুলো। রাষ্ট্র যেদিন জানিয়ে দেয়, এ দেশ তোমার দেশ নয়, সেদিন থেকেই ওরা পরিণত হয় উদ্বাস্তুতে। তাদের ঠাঁই হয় কারাগার কিংবা শরণার্থী শিবিরে, অথবা এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশের দিকে এগিয়ে চলে তারা মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে পাওয়ার আশায়। ব্যাডমিন্টন কোর্টের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভেসে বেড়ানো শাট্‌ল ককে উদ্বাস্তুদের এই অবস্থা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রাজডাঙা নব উদয় সঙ্ঘে। শিল্পী সুব্রত ব্যানার্জির ভাবনায় তৈরি মণ্ডপে গোলাকার পৃথিবীর ওপর রাষ্ট্রতন্ত্রের প্রতীক হিসাবে বসানো হয়েছে অস্ত্রে সজ্জিত এক চেয়ার। সেই চেয়ারের অঙ্গুলি হেলনে বিশাল এক ক্রেনের সাহায্যে টেনে তোলা হচ্ছে মানুষ ঝুলে থাকা একটি শাট্‌ল কককে। নিচে ব্যারিকেড টপকানোর চেষ্টা করছে কিছু মানুয। উদ্বাস্তুদের অবস্থা বোঝাতে সেখানে রাখা হচ্ছে বিশাল এক উড়ন্ত ফিনিক্স পাখি। গ্রিক পুরাণে ফিনিক্স পাখির মৃত্যু নেই। খসে পড়া পালক থেকে জন্ম নেয় আর এক ফিনিক্স। 
শিল্পীর কথায়, ‘‌সারা পৃথিবীর কাছে পরমাণু যুদ্ধের চেয়েও বড় সমস্যা উদ্বাস্তু, এ কথা বোঝাতে মণ্ডপে বিভিন্ন দেশের পতাকার রঙে রাঙানো নানা মাপের র‌্যাকেট আর অজস্র শাট্‌ল কককে উড়ন্ত অবস্থায় দেখানো হয়েছে। শাট্‌ল ককগুলো একত্রিত হচ্ছে, আবার ছড়িয়ে পড়ছে। জানলাগুলো দিয়ে উঁকি মারছে শিশুর মুখগুলো। তাদের আগলে রেখেছে মায়ের জোড়া হাত। দেবী দুর্গাও বসে আছেন এক ভাঙা শাট্‌ল ককের ওপর। তার আগমনে আনন্দে মেতে উঠেছে মানবরূপধারী শাট্‌ল ককগুলো, প্রার্থনা করছে এই অবস্থা থেকে উদ্বাস্তুদের মুক্তির। 
থিম নির্বাচন সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে রাজডাঙা নব উদয় সঙ্ঘের সভাপতি ১৩ নম্বর বরোর চেয়ারম্যান সুশান্ত ঘোষ জানান, এনআরসি বা উদ্বাস্তু ভারতের এক প্রান্তের শুধু নয়, সারা পৃথিবীর কাছে এক জ্বলন্ত সমস্যা। যখনই মানুষকে উদ্বাস্তু করার চেষ্টা হয়েছে, মানুষ প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গও অতীতে উদ্বাস্তু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। এই সব মানুষ জীবন সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর মতে, মানুষ জন্মালে, তার ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত। সেটা যাতে বজায় থাকে, তা দেখার দায়িত্ব সকলের। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top