দেবাশিস পাঠক: যাক বাবা। নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। বোঝা গেল, অতি বাম হোক, কিংবা অতি ডান, অতি রক্ষণশীল হোন বা অতি প্রগতিশীলতার তকমাধারী, সময়টা উনিশ শতক হোক বা বিশ শতকের সাতের দশক কিংবা একুশের দ্বিতীয় দশকের এক্কেবারে শেষ দিক, অতি–র গতিতে সমান নৈরাজ্য। ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে।’ বিদ্যাসাগরকে আক্রমণের ট্র্যাডিশন। এ ব্যাপারে অতি রামের সঙ্গে অতি বামের কোনও তফাত নেই।
১৮৬৯ সাল। বীরসিংহ ছেড়ে বিদ্যাসাগর চলেছেন পালকিতে চেপে। চিরদিনের জন্য। তঁার এই শেষ যাত্রায় খুশি বীরসিংহর মানুষজনের একাংশ। তারা গেঁাড়া হিন্দুর দল। ঘোর বিদ্যাসাগর বিদ্বেষী। তাদেরই মধ্যে একজন বিদ্যাসাগরের পালকির পেছন পেছন চলেছে গোবর ছড়া দিতে দিতে। আর–একজন চলেছে ঢাক বাজাতে বাজাতে। এদের পেছনে একদল লোক। তারা বিদ্যাসাগরকে নিয়ে ঠাট্টা–মশকরা করছে। বীরসিংহ থেকে বিদ্যাসাগরের সেই অন্তিমযাত্রার সাক্ষী ছিলেন তঁার এক ছাত্র, রজনীকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তখন বরদার তালুকদার। ‘মাধবী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তঁার স্মৃতিচারণা। শিরোনাম ‘‌বিদ্যাসাগরস্মৃতি’‌। সেখানে তিনি লিখেছেন, প্রাক্তন ছাত্রের শত অনুরোধেও সেদিন বিদ্যাসাগর বরদায় রজনীকান্তের বাসস্থানে নেমে এক গেলাস জল ছাড়া কিছু মুখে দেননি। শুধু বলেছিলেন, ‘‌আর আমি এই অকৃতজ্ঞ লোকদের কাছে আসব না।’‌
১৯৭০–‌এর দশক। নকশাল আন্দোলনে উত্তাল কলকাতা। কলেজ স্কোয়্যারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকিয়ে বসেছিল বঙ্গ রেনেসাঁর প্রাণপুরুষের মূর্তি। আলটপকা বিপ্লব স্পন্দিত বুকে একদল তরুণের মনে হল, বিদ্যাসাগর প্রতিক্রিয়াশীল ছিলেন। তিনি সংস্কৃত কলেজে ইংরেজদের তঁাবেদারি করতেন। সিপাহি বিদ্রোহের সময় মঙ্গল পাণ্ডেদের পাশে দঁাড়াননি। ভারতের কৃষক সমাজের স্বার্থরক্ষায় কিংবা কৃষিজীবীদের আন্দোলনে সমর্থন কিংবা অংশগ্রহণ নিয়ে তঁার কস্মিনকালে কোনও মাথাব্যথা ছিল না। অতএব, তঁার মাথা কাটা পড়ল এক জুন মাসের রাতে। সেই সঙ্গে বাঙালির মাথাও। লজ্জায়। যে আম বাঙালি, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ও সংস্কৃতি সচেতন, মনে মনে নকশাল আন্দোলনের প্রতি একটা চোরা টান অনুভব করতেন, তাঁরাও এতটা বাড়াবাড়ি মেনে নিতে পারেননি। নিজেদের অতি বামপনার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন এক লহমায়। জনসমর্থনের রস না মেলায় বিপ্লবের শিকড় অচিরেই শুকিয়ে গিয়েছিল। ডালপালা খসেছিল প্রশাসনিক চাপের চোটে।
প্রায় সাড়ে চার দশক পরের ছবি। ২০১৯–‌এর বাংলা। লাল ঢেউয়ের বদলে গেরুয়া ঘেউ ঘেউ। চীনের চেয়ারম্যানের বদলে ধর্মের ঢাল। বাঙালির মনে মনে চোরা স্রোতের অযুত সমীকরণ। সেটা টের পেয়ে গুজরাটে যাদের হাতে মৃত্যু উপত্যকা রচিত হয়েছিল, তারা বাংলায় ঘঁাটি গেড়ে বসেছে। অস্ত্র কারবারি আর টাকার বাক্সধারীদের আচমকা রমরমা। এরকম একটা আবহে মে মাসের সন্ধেতে ফের ভাঙল বিদ্যাসাগরের মূর্তি। শহর কলকাতায়। রোড শোতে রড শোয়ের মহিমায়। এবারও বাঙালির হৃদয় ভেঙে চুরমার হবে কি না, হিন্দি বলয়ের হিন্দুত্ববাদী ভৈরবদের প্রতি অন্তস্তলে আলগা ফল্গু–টান অনুভব করা বাঙালি ফের সচেতন হয়ে নিজেদের ওই মৃত্যু ও বিভেদের কারবারিদের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে নেবে কি না, সে কথা সময় বলবে।
আমরা ভাবছি অন্য কথা। যারা ওই বিদ্যাসাগরের মূর্তিটা ভাঙল তারা জানে, তারা জানত,  বিদ্যাসাগর কে, কী, কেন? এই শহর কলকাতায় যারা মূর্তি ভাঙার সময় শ্লোগান তুলল, ‘‌বিদ্যাসাগরের দিন শেষ, হাউজ দ্য জোশ?’‌ না, জানত না।   জানার দায়ও নেই তাদের। তাই, তাই-ই, শ্লোগানে গর্জনে জোশের মহিমা প্রদর্শনে প্রবল আওয়াজের মধ্যে চুর চুর হয়ে যান বিদ্যাসাগর। তাঁরই নামাঙ্কিত কলেজের দোরগোড়ায়।
তা বলে কি তফাত নেই? আলবত আছে। গোঁড়া হিন্দুরা বিদ্যাসাগরের বিরোধিতা করেছিল শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে। অতি বামদেরও একটা প্রবল তাত্ত্বিক আবডাল ছিল। ২০১৯-এ ওসব বালাই নেই। দায় এড়ানোর ছেঁদো বহর আছে। ‘‌আমরা নই, ওরা’‌ বলে পার পেয়ে যাওয়ার একটা মরিয়া অথচ ধরা পড়ে যাওয়ার পর কঁাদুনি গাওয়া গোছের চেষ্টা আছে। আছে যে, তার কারণ সম্ভবত একটাই। চৌকিদারের বাকি স্যাঙাতরা না জানলেও, বঙ্গ ব্রিগেডের কর্তামশাই অন্তত বিদ্যাসাগরের জেলার মানুষ হওয়ার সুবাদে জানেন, বিদ্যাসাগর নিয়ে বাংলার আবেগ কতটা তীব্র। তাই, অন্যের ঘাড়ে মূর্তি ভাঙার দায় চাপানোর খেলা চলছে। নইলে বিদ্যাসাগর নিয়ে চৌকিদার ও তেনার স্যাঙ্গাতদের ভাবতে ভারি বয়ে গেছে। ওঁরা যে নির্বাচকমণ্ডলীর ভরসায় ছাতি ছাপান্ন করার খোয়াব দেখছেন, তাদের নিত্য ধূপ ধুনো দেওয়া ঠাকুরঘরে তো আর বিদ্যাসাগরের ছবি থাকে না!‌

জনপ্রিয়

Back To Top