‌চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, কাটোয়া, ৩ জুন- ভিলেন করোনা। বাধ্য হয়েই ফিরছেন ওঁরা। নানা রাজ্য থেকে। দলে দলে। ট্রেনে, বাসে, সাইকেলে। সঙ্গে আপশোস, দুটো বাড়তি পয়সার লোভে গিয়েছিলাম। লকডাউন হতেই আমাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। ফিরেও তাকাননি মালিকরা। সেখানকার সরকারি ব্যবস্থার ওপর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। আর ‘নাক কান মুলে’ শপথ করছেন, ঘাট হয়েছে। আর অন্য রাজ্যে যাচ্ছি না। দিদির রাজ্যেই থাকব। যা হোক জুটিয়ে নেব। না খেতে পেয়ে তো আর মরতে হবে না। তঁাদের কথায় উঠে আসে সেখানকার সরকারি ব্যবস্থার ওপর রাগ–অভিমানও। ‘কুকুর–ছাগলের মতো ব্যবহার। খাবার মুখে দেওয়া যায় না। তা–‌ও যেভাবে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেয়! পরিস্থিতির জন্যই খাবারের লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম।’ ক্ষোভ উগরে দিলেন মুম্বইয়ের ভাণ্ডুপ এলাকার রেস্তোরাঁ কর্মী কাটোয়ার সুজিত দাস। সেখানকার ‘দূর ছাই’ মনোভাবে বিরক্ত সুজিত–সহ কাটোয়ার তিন যুবক ঠিক করেন, বাড়ি ফিরবেন। ১০ দিন ধরে হেঁটে, লরিতে, আবার হেঁটে তবে বাড়ি। কাটোয়ার তৃণমূল বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জির দাবি, মমতা ব্যানার্জির প্রস্তাব মেনে শুরুতেই যদি কেন্দ্র পরিযায়ীদের ফেরানোর সিদ্ধান্ত নিত, তাহলে সংক্রমণ বা হয়রানি এতটা বাড়ত না।
চেন্নাই সেন্ট্রাল থেকে মুর্শিদাবাদে ফেরার জন্য বন্ধুদের টাকায় কিনেছিলেন সাইকেল। সেই সাইকেলে চড়েই মোহন শেখ, বুলেট শেখ–সহ ৮ শ্রমিক ১৮০০ কিমি রাস্তা ঠেঙিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। যে নির্মাণ সংস্থার অধীনে কাজ করতেন, লকডাউনে ওই সংস্থা হপ্তাখানেক খাবার দিয়ে হাত গুটিয়ে নেয়। বাংলায় এসে পুলিশের যে ‘সহযোগিতা ও সহমর্মিতা’ পেয়েছেন তা আজীবন ‘বাঁধিয়ে রেখে’ বাংলাতেই কিছু করে পেট চালাতে বদ্ধপরিকর মোহন–‌বুলেটরা।
মুর্শিদাবাদের নওদা থানার মধুপুর সাঁকোপাড়ার যুবক সেলিম শেখের কাহিনি তো আরও হাড়হিম। মেধাবী সেলিম গত ফেব্রুয়ারিতে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়তে নবি মুম্বইয়ে গিয়ে প্রতারকের খপ্পরে পড়েন। সব পয়সা দালালের পেটে চলে যাওয়ায় বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে ইতি টেনে একটা হোটেলে বয়ের কাজ নেন। লকডাউন ঘোষণা হতেই হোটেল মালিক মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলে কোনও দিন আধপেটা, কোনও দিন পেটে গামছা বেঁধে কাটিয়ে শেষমেশ ‘দিদির দেশেই (পশ্চিমবঙ্গ)’ ফেরার পথ ধরেন। টানা ২ দিন হেঁটে একটি মালবাহী লরিতে চেপে খড়্গপুর। সেখান থেকে ফের পায়ে পায়ে, কখনও রেলপথ, কখনও হাইওয়ে ধরে কাটোয়ার ফেরিঘাটে নৌকোয় ওঠার সময় বছর ছাব্বিশের সেলিম বললেন, ‘এখানকার পুলিশ বলুন, প্রশাসন বলুন, কত মানবিক। বুঝলাম জীবনে পয়সাটাই সব নয়। মায়া–মমতারও দরকার আছে।’ এ রাজ্যের ‘স্নেহের পরশ’ পেয়ে সেলিমদের তাই ধনুক ভাঙা পণ, নিজের ভিটেয় আলুসেদ্ধ–‌ভাত খেয়ে থাকব। তবু অন্য রাজ্যে? নৈব নৈব চ।

 

নৌকোয় চড়ে গ্রামে ফিরছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। ছবি:‌ প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top