গৌতম মণ্ডল, সুন্দরবন, ২৮ মে- বারে বারে ঘূর্ণিঝড়কে আটকে দিয়ে প্রাচীরের কাজ করেছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য। অতীতে সুন্দরবনকে রক্ষা করেছে এই ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। কিন্তু বিধ্বংসী আমফানের পর‌ সুন্দরবনের সমুদ্র, নদী ও খাঁড়ি উপকূলের ম্যানগ্রোভের বন ক্রমে শুকিয়ে যাচ্ছে। আমফান ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টা পর থেকে ম্যানগ্রোভের পাতাগুলি হলুদ হতে শুরু করে। এরপর ক্রমে শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। পাতার সঙ্গে সঙ্গে ডালপালাগুলিও শুকিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে কেওড়া ও বাইন গাছের ওপর বেশি প্রভাব পড়েছে। আগামী দিনে এই ম্যানগ্রোভ অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সুন্দরবন গবেষকরা।
ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কাকদ্বীপের প্রশাসনিক বৈঠক থেকে বন দপ্তরকে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ ও নতুন করে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে বন দপ্তরের দেওয়া হিসেব অনুযায়ী প্রায় ৪ হাজার বর্গ কিমি বনাঞ্চলের ক্ষতি হয়েছে। ম্যানগ্রোভের পাশাপাশি সুন্দরবন জুড়ে ইউক্যালিপটাস, শিরীষ, বাবলা, তেঁতুল, কলা গাছের পাতাও হলুদ হয়ে শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। শুধুমাত্র নদীবাঁধ এলাকাতেই নয়, বাঁধ থেকে অনেক দূরের গাছও শুকিয়ে যাচ্ছে। এক লহমায় মনে হবে, গাছগুলির ওপর অ্যাসিড ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমফানের জেরে সুন্দরবন জুড়ে প্রায় আড়াই লক্ষ গাছ ভেঙে পড়েছে বা উপড়ে গিয়েছে। কিন্তু দাঁড়িয়ে–থাকা গাছের পাতাও ক্রমে শুকিয়ে যাওয়ায় পরিবেশবিদরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। অতীতে আইলার সময় নোনা জল ঢুকে বেশ কিছু গাছপালা পুরোপুরি শুকিয়ে মরে যায়। এবার আমফানের পর গাছের মড়ক সংখ্যায় অনেক বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে লোকালয়ে বাঘ ঢোকা আটকানোর জন্য ফেন্সিং দেওয়া হয়েছিল। সেই ফেন্সিংয়ের অনেকাংশ ক্ষতি হয়েছে। নতুন করে ফেন্সিং দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
সুন্দরবনের বড় অংশ বাংলাদেশের মধ্যে পড়ে। তুলনায় দুই ২৪ পরগনার ম্যানগ্রোভ অনেকটাই কম। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মাছের ভেড়ি, ইটভাটা তৈরির জন্য নির্বিচারে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে চলেছে বলে অভিযোগ। রাজ্য সরকার ম্যানগ্রোভ জঙ্গল বাড়ানোর লক্ষ্যে নদী–তীরবর্তী এলাকায় কয়েক লক্ষ গাছের চারা বসিয়েছে। সম্প্রতি বুলবুল ঝড়ের পরও জেলা প্রশাসন পাথরপ্রতিমা, নামখানায় ম্যানগ্রোভের চারা রোপণ করেছে। কিন্তু প্রকৃতির রোষে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের বড়সড় পরিবর্তন ঘটে যেতে চলেছে। নোনা জল সব কিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। ম্যানগ্রোভ নোনা জলে বেড়ে ওঠার ফলে নতুন কোনও বিপদ এতদিন ছিল না। কিন্তু ঝড়ের তীব্র দাপটের ফলে ম্যানগ্রোভের উপরিভাগ ঘষা লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার ফলে ম্যানগ্রোভের ওপরের অংশ শুকিয়ে হলুদ হয়ে যাচ্ছে। নিচের সবুজ অংশ অক্ষত আছে। উল্টোদিকে নোনা জলের ঝাপটায় উপকূলের অন্য গাছগুলির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমফানের সময় সমুদ্রের জলের লবণের পরিমাণ বেশ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেই জল সব শেষ করে দিয়ে গিয়েছে। এছাড়াও নামখানা, পাথরপ্রতিমার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আমফানের দিন বৃষ্টিতেও লবণ ছিল। অন্য বৃষ্টির সঙ্গে তফাত ছিল এই বৃষ্টির। অনেকেই বৃষ্টিতে ভেজার পর গা–জ্বালা অনুভব করেন। সেই বৃষ্টির জলের স্বাদ ছিল পুরো নোনা। অতীতে কখনও এমন ঘটেনি বলে জানিয়েছেন এলাকার প্রবীণ মানুষেরা।

লুটিয়ে পড়েছে ম্যানগ্রোভ। ছবি: প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top