আজকালের প্রতিবেদন‌: ‘‌কিছু মানুষ বিজেপি–‌র মাউথপিস হয়ে কথা বলছেন। রাজ্যে সমান্তরাল প্রশাসন চালানোর চেষ্টা করছেন। এটা সাংবিধানিক নয়।’‌বৃহস্পতিবার রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ের নাম না করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‌‘‌সাংবিধানিক পদ নিয়ে আমি কিছু বলি না। কিন্তু কিছু মানুষ বিজেপি–‌র মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন। সীমা রেখে কথা বলা উচিত।’
রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের কাজে ‘‌‌কেন্দ্রীয় সরকারের মনোনীত’ রাজ্যপাল কতটা হস্তক্ষেপ করতে পারেন, সেই বির্তক বহুদিনের। রাজ্যে রাজ্যে এ নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতিও কম হয়নি। এমনকী রাজ্যপালের পদ অবলুপ্তির প্রস্তাবও একসময়ে রাজনীতিকরা তুলেছিলেন। এই রাজ্যের নতুন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় যাবতীয় ‘‌রীতিনীতি’ এবং ‘‌নজির’‌ ভেঙে ইতিমধ্যেই প্রশাসনের কাজে পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ শুরু করেছেন। সরকারকে না জানিয়ে, সরকারের ‘‌নিষেধ’‌ না শুনে, সরকারের ‘‌প্রশাসনিক’‌ অধিকারকে কার্যত তাচ্ছিল্য করে তিনি কর্মসূচি তৈরি করছেন। শুধু কর্মসূচি নয়, সরকারের কাজ নিয়ে তাঁর বিবিধ ‘‌মন্তব্য’ রাজনৈতিক মহল হতচকিত। সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যপাল সরকারে‌র প্রধান। তাঁর এই ‘‌সরকার বিরোধিতা’‌ কতটা সাংবিধানিক তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের মন্ত্রীরা ইতিমধ্যেই রাজ্যপালের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে মত দিতে শুরু করেছেন। শুধু তৃণমূল সরকারের মন্ত্রীরা নন, বৃহস্পতিবার কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরিও রাজ্যপালকে সরাসরি আক্রমণ করেছেন। বলেছেন, রাজ্যপাল অকারণে রাজ্যের সঙ্গে সঙ্ঘাতে যাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি অবশ্য রাজ্যপালের নাম করছেন না। গত সপ্তাহে দলের কোর কমিটি বৈঠকের পর তিনি নাম না করেই রাজ্যপালকে ‘বিজেপি–‌র পার্টিম্যান’ বলে তোপ দেগেছিলেন।   
এদিন নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‌কেন্দ্রে নির্বাচিত সরকার। রাজ্যেও তাই। তাই কেন্দ্র রাজ্যের একসঙ্গে কাজ করা উচিত। কিন্তু এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে, কিছু মানুষ বিজেপি–‌র মাউথপিস হয়ে কথা বলছেন।’‌ 
স্বাস্থ্য দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, ‘‌রাজ্যপাল রাজনৈতিক নেতার মতো কথা বলছেন, এটা খুবই দুঃখজনক। রাজ্যের মানুষ চান সাংবিধানিক মর্যাদা রেখে তিনি কাজ করুন।’‌ 
কয়েকদিন ধরে সরকারের ‘‌বিরোধিতা’ করার পর‌ এদিন রাজ্যপাল সেই সুরকে যেন আরও শানিয়েছেন। বলেছেন, ‘‌যা যা চাপা দেওয়া হচ্ছে আমি সেগুলি প্রকাশ করতে চাইছি।’ ১১ নভেম্বর শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার পথে হঠাৎই সিঙ্গুরের বিডিও অফিসে হাজির হন জগদীপ ধনকড়। অথচ আগে থেকে সফরের বিষয়ে রাজ্য প্রশাসনের কাউকেই তিনি জানাননি। স্বাভাবিক কারণেই সেখানে কোনও প্রশাসনিক শীর্ষকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। সেই সময় রাজ্যপাল উপস্থিত কিছু স্থানীয় বাসিন্দাদের বলেন, তাঁদের কোনও বক্তব্য থাকলে তাঁকে ই–মেল করতে পারেন। তিনি তার জবাব দেবেন। বৃহস্পতিবার ফের সেই সিঙ্গুর সফর নিয়ে সরব হন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়। তিনি বলেন, ‘‌আমি সিঙ্গুর গিয়েছি বলেই রাজ্যের একটি রাজনৈতিক দলের মহিলারা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। যার জেরে আমি দুঃখ পেয়েছি।’‌ এরপরই তিনি বলেন, এই ঘটনার পর সিঙ্গুর–‌নন্দীগ্রাম গিয়ে আরও বেশ কিছু সময় কাটাতে তাঁর ইচ্ছা করছে।  

 

জানা গেছে, সিঙ্গুরে বাড়িও খুঁজছেন। সিঙ্গুর–নন্দীগ্রাম নিয়ে তাঁর এই উৎসাহ আসলে রাজ্য সরকারকে বিব্রত করার কৌশল বলে মনে করছেন রাজ্যের রাজনৈতিক মহল। এদিন আবার রাজ্যপাল হেলিকপ্টার নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছেন। শুক্রবার তিনি ফরাক্কার এস এন এইচ কলেজের রৌপ্যজয়ন্তীতে প্রধান অতিথি হিসেবে সস্ত্রীক যাচ্ছেন। ভোর ৫টায় রওনা হবেন। ফেরার পথে সিউড়ি সার্কিট হাউসে বিশ্রাম নেবেন। বর্ধমানে সার্কিট হাউসে সন্ধেয় কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফিরবেন। এই সূচির কথা জানিয়ে রাজ্যপালের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলে দেওয়া হয়েছে, ৬০০ কিমি যাতায়াতের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে হেলিকপ্টার চেয়েও পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে রাজ্যের স্বাস্থ্য রাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি দেখতেই মুখ্যমন্ত্রী হেলিকপ্টার নিয়েছিলেন। রাজ্যপালের কেন হেলিকপ্টার প্রয়োজন?‌‌‌‌‌
শুধু রাজ্যপাল নন, ‘‌বুলবুল’‌ দুর্যোগ নিয়েও রাজনীতি করা হচ্ছে বলে মনে করছে সরকার। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল পাঠাবেন বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। কিন্তু তার আগেই কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় একক উদ্যোগে আচমকাই হাজির হন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়। আগ বাড়িয়ে বাবুলের এই যাওয়াকে মোটেই ভাল চোখে দেখছে না তৃণমূল। তেমনই মহারাষ্ট্রে সরকার গঠন নিয়ে রাজ্যপালের ভূমিকাতেও দেশ জুড়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচনা করতে ছাড়েনি বিজেপি–‌বিরোধী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তৃণমূলও। এদিন নবান্ন সভাঘরে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি মত প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, নিয়ম অনুযায়ী এককভাবে কারও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় যাওয়া সমীচীন নয়। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, রাজ্যকে এড়িয়ে কীভাবে গেলেন বাবুল সুপ্রিয়?‌ মুখ্যমন্ত্রীর জবাব, ‘এই দুর্যোগ নিয়ে রাজনীতি করছেন কেউ কেউ। বড় বড় কথা বলছেন। ভাঙচুর করা হচ্ছে। এখন তা করার সময় নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ান। রাজনীতি সারা জীবন থাকবে। দুটো লোক নিয়ে ভাঙা যায়। কিন্তু গড়া অনেক শক্ত কাজ।‌’

সাংবাদিকদের মুখোমুখি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। নবান্নে। ছবি:‌ বিজয় সেনগুপ্ত

জনপ্রিয়

Back To Top