অমিতাভ সিরাজ, দার্জিলিং: উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি।
কী বলব?‌ স্লোগান নাকি বার্তা!‌
দার্জিলিঙে এই প্রথম বার শিল্প সম্মেলন শুরু হল। তার শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ওই দুই শব্দবন্ধই যেন গেঁথে দিল প্রত্যেক পাহাড়বাসীর মনে। তঁাদের মনের শিখর ছুঁয়ে মমতা বার্তা দিলেন, ‘‌আপনারা যদি শান্তি আনতে পারেন, আমি সমৃদ্ধি এনে দেব। উন্নয়ন হবে পাহাড়ে।’‌
আর এই উন্নয়নের পথে ‘‌কঁাটা’‌ মোদি, তা বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন মমতা। তাই মোদির নাম না ‌করে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেনও, ‘‌দিল্লিকে বলছি, মদত দেবেন না। কোনও একটা আসনের জন্য বাংলাকে দু’‌টুকরো করবেন না।’‌
আজ এখানে চৌরাস্তায় ‘‌হিল বিজনেস সামিট’‌ উপলক্ষে সকাল থেকেই উপচে–‌পড়া ভিড় ম্যাল–চত্বরে। হালকা রোদের ঝিলিক আরও উজ্জ্বল করে তুলেছিল সম্মেলন–‌কক্ষ। শিল্পপতি থেকে রাজ্যের মন্ত্রী, পাহাড়ের বিধায়ক, মোর্চা–‌জিএনএলএফ নেতা, প্রশাসনের আধিকারিক, ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি শিল্প সম্মেলনের তাৎপর্যও বাড়িয়ে দিয়েছিল বহু গুণ। নিরাপত্তাও জোরদার। তবু বাইরে কৌতূহলী জনতা ঠায় দঁাড়িয়ে ছিল মুখ্যমন্ত্রী কী বার্তা দেন, তা শুনতে।
পাহাড়ে বিনিয়োগ টানতে তঁার ভাষণের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী দার্জিলিং জুড়ে শিল্পায়নের বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘‌চা, পর্যটন, পরিবহণ— এই সব তো আছেই। কিন্তু তার বাইরেও বহু শিল্প গড়ে উঠতে পারে। তাকে খুঁজে বের করতে হবে। আলোচনায় সে–‌সব উঠে আসবে।’‌ মমতা বলেন, ‘‌হর্টিকালচার, অর্কিড ও তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সম্ভাবনাও প্রচুর। এখানকার ছেলেমেয়েদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা খুবই জরুরি। তাদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শান্তি না ‌থাকলে উন্নয়ন হবে কী করে?‌’‌ মমতা এদিন জানিয়েছেন, পাহাড়ের টানা অশান্তিতে চা–শিল্পে ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ছ’‌মাস বন্‌ধে ক্ষতি এক হাজার কোটি টাকা। তাই দু’‌‌দিনের এই শিল্প সম্মেলনে পাহাড়ের উন্নয়নের পথ খুলে যাক, এই আশাই করছেন মমতা। তঁার কথায়, ‘‌আসুন, কাজ শুরু করি। শিল্পবন্ধুরাও প্রস্তুত। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সব সুযোগ–সুবিধা দেব। শুধু শান্তি যেন বজায় থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।’‌
এদিন অনুষ্ঠানের সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রদীপ জ্বালিয়ে। মঞ্চে তখন উপস্থিত মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, গৌতম দেব, ইন্দ্রনীল সেন, রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, বিনয়কৃষ্ণ বর্মন–‌সহ বিনয় তামাং, অনীত থাপা, মন ঘিসিং, অমরসিং রাই, রোহিত শর্মা প্রমুখ। শিল্পপতিদের মধ্যে সত্যম রায়চৌধুরী, সঞ্জয় বুধিয়া, হর্ষ নেওটিয়া, রুদ্র চ্যাটার্জি, ময়ঙ্ক জালান, সিআইআই–‌এর চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি এবং আরও অনেকে। প্রশাসনের পক্ষে মলয় দে, অত্রি ভট্টাচার্য, আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, জেলাশাসক জয়শী দাশগুপ্ত প্রমুখ। মুখ্যমন্ত্রী তঁার ভাষণে এদিন পাহাড়বাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘‌আপনারা ভাল থাকুন, এটাই চাই। জাপান এখানে বিনিয়োগ করতে চায়। পাহাড়ে ভেষজ শিল্প হতে পারে। হার্বাল প্লান্ট গড়ে তোলা যায় ওষুধ শিল্পের প্রয়োজনে। দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং, মিরিকে তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক গড়ে উঠতে পারে।’‌ এ ছাড়া খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের জন্য বিশেষ অঞ্চল তৈরি করেও বাণিজ্যিক সাফল্য আসবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস মমতার। তিনি বলেন, ‘‌হর্ষ নেওটিয়া ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন পাহাড়ে। কার্শিয়াঙে মেডিক্যাল কলেজ হবে। টাইগার হিল ও আরও অনেক জায়গায় কটেজ তৈরি করে পর্যটন শিল্পে উন্নতি করা যায়। হোটেল ব্যবসায়ীরা আগ্রহী। এ–‌সব নিয়ে আলোচনা হোক ওই শিল্প সম্মেলনে।’‌ মুখ্যমন্ত্রী বিনয় তামাং, মন ঘিসিংয়ের উদ্দেশে বলেন, ‘‌আমি চাই, তোমরা আরও সুন্দর করে সাজিয়ে তোলো দার্জিলিংকে। সবুজ ও পরিচ্ছন্ন করে। জলের সমস্যা র‌য়েছে, তা মেটাতে হবে। সরকার সব আলোচনার পথ খুলে রেখেছে। নতুন প্রজন্মকে সুরক্ষা দিতে আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করে দিতে হবে।’‌ এ প্রসঙ্গে রাজ্য সরকারের কন্যাশ্রী, খাদ্যসাথী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদিতে বিভিন্ন প্রকল্পের কথা মনে করিয়ে দিয়ে মমতা বলেছেন, ‘‌এ–‌সবের সুযোগ নিন আপনারাও। শুধু শান্তি রাখুন আর দার্জিলিং কী করতে পারে, গোটা দেশকে বুঝিয়ে দিন।’‌

জনপ্রিয়

Back To Top