রিনা ভট্টাচার্য- জরুরি পরিষেবার যাতে কোনওভাবেই ব্যাঘাত না ঘটে, চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীরা যাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন এবং তাঁদের যাতে হেনস্থার শিকার হতে না হয়, তার নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বুধবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, ‘‌রাজ্য সরকারের দায়বদ্ধতা আছে, মানবিকতাও রয়েছে। তাই যাতে কারও কোনও সমস্যা না হয় এবং প্রত্যেকে জরুরি পরিষেবা যাতে পান তা নিশ্চিত করবে রাজ্য সরকার। এর জন্য কিছু পদক্ষেপও করা হয়েছে।’‌
মুখ্যমন্ত্রী জানান, এবার থেকে জরুরি পরিষেবার মধ্যে হোম ডেলিভারিকেও রাখা হল। সেইসব সংস্থার জন্য ‘‌পাস’‌ ইস্যু করবে পুলিশ, প্রশাসন। প্রত্যেক সংস্থাকে একটা করেই পাস দেওয়া হবে। সেই পাস কপি করে সেল্ফ অ্যাটেস্টেড করে নিতে হবে। ওই পাস দেখালে পুলিশ, প্রশাসন ছেড়ে দেবে। তিনি বলেন, ‘‌‌অসংখ্য প্রবীণ নাগরিককে হোম ডেলিভারির ওপর ভরসা করতে হয়। জরুরি পরিস্থিতির কারণে তাঁরা না খেয়ে থাকবেন, এটা তো হতে পারে না। তাই এঁদের কোনওভাবেই আটকানো যাবে না। একটাই পাস রাজ্যের সব জেলায় চলবে।’‌ বড় বড় আবাসনের আবাসিকদের কাছে মুখ্যমন্ত্রীর আবেদন, সেখানে থাকা একা, প্রবীণ বাসিন্দাদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, তা তাঁরা দায়িত্ব নিয়ে দেখুক।
জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, থানা ইনচার্জদের উদ্দেশে বলেন, ‘‌এই ধরনের সমস্যা যাতে না হয় তা দায়িত্ব নিয়ে দেখতে হবে। সিভিক ভলান্টিয়ার, হোমগার্ডকে দায়িত্ব দিলে তাঁরা অনেক সময় না জেনেই অনেককে আটকে দেন। সবজি বিক্রি করতে গেলে অনেককে আটকে দেওয়া হচ্ছে। এটা করা যাবে না। প্রত্যেককে সতর্কতার সঙ্গে বাজার করতে হবে।’‌ তিনি ছবি এঁকে দেখিয়ে দেন কীভাবে বাজারে লাইন করে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, ‘‌এক এক করে লাইন দিয়ে দাঁড়ান। দূরত্ব বজায় রাখুন। অতিরিক্ত জিনিস মজুত করা যাবে না।’‌
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌কৃষকরা মাঠে কাজ করতে চাইলে তাঁদের কাজ করতে দিতে হবে। এক্ষেত্রে তাঁদের সতর্ক থাকতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, গ্রামবাংলার মাঠে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা এমনিতেই দূরত্ব রেখে কাজ করেন। এক জায়গায় জড়ো হয়ে কখনওই তাঁরা কাজ করেন না।’‌
চিকিৎসক, নার্স–সহ স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের যদি কোনওভাবে হেনস্থা করা হয় তাহলে তা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না বলে এদিন জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে সামাজিক দূরত্ব এড়িয়ে চলতে হবে। কিন্তু তার মানে কাউকে এক ঘরে করে দেওয়া নয়। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকেরা সারা দিন কাজ করে ফিরছেন। তারপর বাড়িওয়ালা বাড়ি ঢুকতে দিচ্ছেন না, এটা চলবে না। তাঁরা যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেই কাজ করেন। তাঁরা মানুষকে সুস্থ করে তোলেন। তাঁরা যাতে নিজেরা সংক্রমিত না হয়ে পড়েন তার জন্য আগাম সতর্কতা নিয়ে নেন। তাই তাঁদের কোনওভাবেই বয়কট করা চলবে না। কারও জ্বর হলে পুলিশকে খবর দিন। তারা ব্যবস্থা করবে।’‌
প্রসঙ্গত, কয়েক দিন ধরেই রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে খবর আসছে, হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে চিকিৎসক ও নার্সদের সামাজিক অসম্মানের মুখে পড়তে হচ্ছে। কোথাও আবার জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের নিয়ে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এইসব যাতে বন্ধ হয় তা দেখার জন্য পুলিশকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কেউ এই নির্দেশ অমান্য করলে তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই চিকিৎসক নার্সদের হাসপাতালের কাছাকাছি হোটেল, লজ, বিয়েবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করেছে। 

 

হাসপাতালগুলিতে অসংখ্য নিরাপত্তা কর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য হাসপাতালগুলিকে নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। খাবারের জন্য টাকার কোনও অভাব হবে না বলে আশ্বাসও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
যাঁরা বোতলবন্দি পানীয় জল খান, তাঁদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ‘‌পানীয় জল প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি এখন বন্ধ র‌য়েছে। তাই তাঁরা বোতলবন্দি পানীয় জল পাচ্ছেন না। তবে চিন্তার কারণ নেই। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের তৈরি জলের বোতল ‘‌প্রাণধারা’‌ পৌঁছে দেওয়া হবে। শুধু কন্ট্রোল রুমে জানাতে হবে কাদের প্রয়োজন।’‌
বিদ্যুৎ, পুলিশ, খাদ্য, বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মী যাঁরা জরুরি পরিষেবা দিচ্ছেন তাঁদের জন্য বিশেষ পরিবহণ ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরিবহণ দপ্তরকে হেল্প লাইন চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই নম্বরে ফোন করলেই বলে দেওয়া হবে কোথা থেকে, কোন বাস চলবে।
রাজ্যের চা–বাগান নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌‌সব রাজ্যের চা–বাগান বন্ধ থাকলে এ রাজ্যেও থাকবে।’‌ তিনি এদিন জানান, ‘‌৩১ মার্চ আবার পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা হবে। সব কিছু ঠিক থাকলে কয়েকটি ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া যেতে পারে। যদিও সারা দেশে কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় বিপর্যয় আইনের সহায়তায় লকডাউন ঘোষণা করেছে। এমন পরিস্থিতি আগে কখনও হয়নি। রাজ্য সরকারকে আগাম কোনও কিছু না জানিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এটা করেছে। রাজ্যকে এই সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে। তবু রাজ্যের হাতেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। সামনেই পয়লা বৈশাখ আসছে। পাঞ্জাবেও নতুন বছর শুরু হবে। এ ছাড়াও অনেক রাজ্যে এই সময় নানান উৎসব হয়।’‌ সবার কাছে তাঁর অনুরোধ, ভাববেন না। চিন্তা করবেন না। আপনাদের জন্য আমি আছি।‌
মুখ্যমন্ত্রী এদিন ফের আবেদন করে বলেন, করোনা নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হবেন না। আসুন সবাই মিলে বাড়িতে থেকে সংক্রমণ ঠেকাই। বাংলা একটা পথ দেখাক। বাড়িতে থাকা মানে জেলে থাকা নয়। কারও কোনও অসুবিধা হলে পুলিশ–প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।

জীবাণুমুক্তির কাজ চলছে এসএসকেএম হাসপাতালে। বুধবার। ছবি: শিখর কর্মকার

জনপ্রিয়

Back To Top