আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ বসন্ত ব্রিগেডের ‘‌ঐতিহাসিক’‌ মঞ্চে যেন আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল বামেরা। ‌লোকসভা নির্বাচনের পর আত্মবিশ্বাসে যে ভাটা পড়েছিল, তাই যেন পুনরুদ্ধার করা গেল। এত বিপুল মানুষের সমাবেশ দেখে আত্মপ্রত্যয় যে বেড়েছে, তা মহম্মদ সেলিমের বক্তব্যেও স্পষ্ট। বললেন, ‘‌বসন্ত এসে গেছে, লালরঙা ফুল ফুটবে। কেউ আটকাতে পারবে না।’‌ একসঙ্গে এত লালঝান্ডা উড়তে সত্যিই দেখা যায়নি সাম্প্রতিক অতীতে। সেলিম বলেন, ‘‌লাল ঝান্ডাকে কেউ শেষ করতে পারেনি। কাল ভি হম জিতে থে, আজ ভি জিতেঙ্গে।’‌ সভার শুরুতেই বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেন, ‘‌‌এমন সমাবেশ অতীতে দেখা যায়নি। বিকল্প শক্তি হিসেবে উঠে এসে বাম–কংগ্রেস। যাঁরা বলেন বামেদের দূরবিন দিয়ে দেখতে হয়, তাঁরা সমাবেশের খবর নিন। আজকের পর একদিকে বিজেপি–তৃণমূল, অন্যদিকে আমরা।’‌ 
বাংলার মমতা সরকারের বিরুদ্ধে যেমন তোলাবাজি, দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তেমনই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ‘‌দেশ বেচে দেওয়া’র অভিযোগ তুলতে দেখা গেছে বাম–নেতৃত্বকে। গেরুয়া শিবিরের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ‌বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন সূর্যকান্ত মিশ্র, সীতারাম ইয়েচুরি থেকে শুরু করে আরএসপি নেতা মনোজ ভট্টাচার্য এবং ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা নরেন চ্যাটার্জিদের। তৃণমূলকে ‘‌স্বৈরাচারী’‌, আর বিজেপি ‘ভারতীয় ঝঞ্ঝাটিয়া পার্টি’ আখ্যা দিয়ে গ্রামে গ্রামে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আওয়াজ গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন নরেন চ্যাটার্জি। অন্যদিকে মনোজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘‌মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে। কেন্দ্র ও রাজ্যে রয়েছে ফ্যাসিবাদী সরকার। বিরুদ্ধ–কণ্ঠকে জেলবন্দি করা হচ্ছে। ধর্ম ও ভাষার নামে অসহিষ্ণুতা চলছে। এই লড়াই নিয়ে যেতে হবে গ্রামে গ্রামে। গরিবের ঐক্যই ভারতের বৈচিত্রকে রক্ষা করবে।’‌
সংখ্যালঘুদের জন্য নয়া প্রকল্প, আর্থিক সাহায্য প্রসঙ্গে তৃণমূলকে বিঁধে ইয়েচুরি বলেন, ‘‌ভোটের আগেই কেন এই সাহায্য দেওয়া হচ্ছে?‌ আগে দেওয়া হয়নি কেন?‌ ঘুষ দিচ্ছেন?‌’‌ মমতা এবং এনডিএ জোটের এককালীন সখ্যতার প্রসঙ্গ টেনে ইয়েচুরি বলেন, একুশের ভোটে কোনও দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে বিজেপির সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন মমতা ব্যানার্জি। কেন্দ্রের মোদি সরকারকেও আক্রমণ করে বলেন, ‘‌নিজের নামে ক্রিকেট মাঠের নামকরণ করছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই মাঠেই আবার দুই প্রান্ত আম্বানি–আদানির নামে। কর্পোরেটদের ঋণ মকুব করছেন, আর কৃষকদের করতে পারছেন না?‌’ একই প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন সিপিআই নেতা ডি রাজাও। 
তবে সেলিমের ভাষা ছিল একে বারে চাঁচাছোলা। ‘‌দিনবদলের ডাক’ দিয়ে মমতাকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘‌লকডাউনের সময়ে মানুষ যখন অনাহারে মরছিলেন, তখন আমরা তাঁদের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আর এখন যেই ভোট এসেছে, পাঁচ টাকায় ডিম–ভাত দেওয়া হচ্ছে।’‌ তৃণমূল–বিজেপিকে একযোগে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘‌লুটেরা লুটেরাদের ধরতে পারে না‌। লুটেরাদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে আমাদের যেমন একজোট হতে হবে, তেমনই লুটেরাদের চিহ্নিত করতে হবে।’‌ এই প্রসঙ্গে অভিষেক ব্যানার্জিকেও আক্রমণ করে বলেন, ‘‌যারা লুট করেছে, আমরা ক্ষমতায় এলে তাদের বাড়ি, সে ‘শান্তিনিকেতন’ হলেও নিলাম করব। চাকরি ক্ষেত্রে সমস্ত শূন্যপদ পূরণ করব। নিয়মিত এসএসসি হবে, মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা হবে।’‌ হুঁশিয়ারি দিয়ে সেলিম বলেন, ‘‌তাপ বাড়ছে আর তৃণমূল গলছে। বিজেপি বাষ্পের মতো উবে যাবে।’‌ দেবলীনা হেমব্রমকেও বলতে শোনা যায়, ‘‌সমাজে ভাইরাস বাসা বেঁধেছে। তার জন্য ভ্যাকসিনের দরকার নেই। আমরাই মারব। পদ্মফুল জলে ভাল, কিন্তু এলাকায় ফুটতে দেওয়া যাবে না।’‌
শুধু এই বিপুল জনসমাবেশই নয়, আরও নানা ঘটনার সাক্ষী থাকল এই ব্রিগেড। বিমান বসু, নরেন চ্যাটার্জি, সূর্যকান্ত, মনোজ ভট্টাচার্যের হাত ধরেই ভালই এগোচ্ছিল সভা। কিন্তু তাল অধীরের ভাষণ শুরু হতেই। তাও ‘‌ঐতিহাসিক’‌ ব্রিগেডের ‘‌মান’ ধরে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করে গেলেন বাম শীর্ষ নেতৃত্ব। ‌কিন্তু জোটে ভাঙন কি আটকানো গেল?‌ ব্রিগেডের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কংগ্রেসের উদ্দেশে সিদ্দিকি ‘‌ভাইজান’‌ যে কড়া বার্তা দিলেন, তাতে এই প্রশ্নই মাথাচাড়া দিচ্ছে। অধীরের বক্তৃতা চলাকালীন সিদ্দিকির মঞ্চে ওঠা, জনতার ‘‌ভাইজান’‌ গর্জনে অধীরের বক্তৃতা থামিয়ে দেওয়া, মহম্মদ সেলিম–বিমান বসুদের ছুটে এসে অধীরকে বুঝিয়ে–সুঝিয়ে ফের ভাষণ চালিয়ে যেতে বলা এবং অধীরের ক্রমাগত ঘাড় নাড়তে থাকা– নানা ‘‌তাৎপর্যপূর্ণ’ ঘটনা ঘটল‌ ‘‌ঐতিহাসিক’‌‌ ব্রিগেডে। কিন্তু বারবার সংযুক্ত মোর্চার জয়ধ্বনি দিয়ে বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র থেকে শুরু করে সীতারাম ইয়েচুরি, দেবলীনা হেমব্রম এবং মহম্মদ সেলিমরা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন, জোট রক্ষায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাবেন তাঁরা। 

জনপ্রিয়

Back To Top