প্রদীপ দে, লালবাগ: সন্ধে গড়িয়ে রাত। হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়ার সামনে ভাগীরথী নদীর জল কালো মিশমিশে। আলোর ঝলকানিতে হাজারদুয়ারি মায়াময়। রাত বেড়ে ১০টা। ভাগীরথীর কালো জল আচমকা রঙিন হয়ে ওঠে। রঙিন বেরায় সোনার প্রদীপ জ্বলে বেরা জলের স্রোতের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এগিয়ে চলে। বৃহস্পতিবার রাতে এভাবেই নবাবি আমলের বেরা ভাসানো হল। যে বেরা মুর্শিদাবাদের মানুষের কাছে সম্প্রতির বেরা বলেই চিহ্নিত। সেজন্য বেরা ভাসান দেখতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিলেন ভাগীরথীর পাড়ে।
ভাদ্রের শেষ বৃহস্পতিবার বেরা ভাসানের নিয়ম থাকলেও মহরমের কারণে এবার এগিয়ে আনা হয় বেরা ভাসান। ৩১৫ বছর আগে ১৭০৪ সালে বাংলা–বিহার–ওডিশার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এই বেরা ভাসানের সূচনা করেছিলেন। তখন দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেব। মুর্শিদাবাদ থেকে জলপথে বজরায় পাঠানো হত খাজনা। কিন্তু জলপথে ছিল জলদস্যুর ভয়। জলের দেবতা হলেন খোজা খিজির বা খাওয়াজা খিজির। এই জলের দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে নদীর বুকে বেরা ভাসানো হল। সোনা, চাঁদির প্রদীপ জ্বালিয়ে, চক মিনারের মতো করে সাজানো হত ভেলা। আতশবাজির আলোয় ভাসিয়ে দেওয়া হত বেরা।
সেই নবাবি নিয়ম মেনে আজো এমন উৎসব পালন করে রাজ্য সরকারের আইন বিভাগ। বাঁশ, বাখারি, চাটাই দিয়ে তৈরি করা হয় কলার ভেলার ওপর বেরা। মিনার, চক, গম্বুজ করার পর ঝিকমিকে অভ্রর পাতা দিয়ে সাজানো হয়। বাঁশের তৈরি ছোট ছোট খোপের মধ্যে থাকে প্রদীপ। বৃহস্পতিবার রাত দশটার পর ইমামবাড়ার সামনের ঘাটে ভাগীরথীর জলে শয়ে শয়ে প্রদীপ জ্বলে উঠতেই চারদিক রঙিন হয়ে ওঠে। একটু একটু করে বেরা ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলে, চারপাশ ততটাই উজ্জ্বল আলোকিত হয়। নদীর পাড়ে থাকা হাজার হাজার সব ধর্ম–বর্ণের মানুষ একে অপরকে ভালবাসার আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন। এভাবেই সম্প্রীতির বেরা ভেঙে দেয় কুসংস্কার আর ধর্মের বেড়াকে।‌

ঐতিহ্যের বেরা উৎসব মুর্শিদাবাদের লালবাগে। ছবি: চয়ন মজুমদার

জনপ্রিয়

Back To Top