চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, কাটোয়া: আকাশে মেঘের আনাগোনা। কখনও কয়েক পশলা ঝিরঝিরে বৃষ্টি। পথঘাট লোকবিরল। কাটোয়া শহরের কাছারি রোড ঘেঁষা মহকুমা গ্রন্থাগারে তখন জমজমাট সাহিত্য আড্ডা। মধ্যমণি মহকুমা গ্রন্থাগারের কার্যকরী সমিতির সদস্য প্রাবন্ধিক তুষার পণ্ডিত, গ্রন্থাগারিক রামকৃষ্ণ সিংহ। এমন সময় মেঘ মাথায় করে একটি টোটো এসে থামে গ্রন্থাগারের গেটে। সওয়ারি শহরের তিলিপাড়ার বধূ চৈতালী অধিকারী, কিশোর পুত্র আয়ুষ। আর দুই বস্তাবোঝাই বই।
চৈতালীদেবীর ইচ্ছে, এই বইগুলি যদি গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেন, তা হলে তিনি ও তঁার পরিবার কৃতার্থ হন। বইয়ের বস্তা খুলতেই চোখ চকচকে তুষারবাবু–রামকৃষ্ণবাবুদের। সম্ভারে রবীন্দ্র রচনাবলীর শতবার্ষিকী সংস্করণের তামাম বই, সাহিত্য পরিষদ প্রকাশিত মেঘনাদ বধ কাব্য, ১৩২৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত অক্ষয়কুমার বড়ালের ‘এষা’ কাব্যগ্রন্থ–সহ আরও প্রচুর বই। জানা গেল, বইপোকা ছিলেন চৈতালীদেবীর শ্বশুর মোহনগোপাল অধিকারী। পয়সা জমলেই বই কিনতেন। সময় পেলেই ডুব দিতেন বইয়ের পাতায়। এত বই জমে গিয়েছিল যে বাড়িতে আর রাখার জায়গা হচ্ছিল না। নষ্ট হচ্ছিল মহামূল্যবান গ্রন্থরাজি। ‘তাই সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ রাজি হলে বইগুলি দিয়ে দেব।’ মন্তব্য চৈতালীদেবীর। আর এমন দানে গ্রন্থাগার সমৃদ্ধ হল জানিয়ে তুষারবাবু বলেন, ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার এমন বহু বইপ্রেমীর বিরল বই উপহারে সমৃদ্ধ। চৈতালীদেবীর পরিবারকে ধন্যবাদ।’ চৈতালীদেবীর শ্বশুর মোহনগোপাল কোনও অনুষ্ঠানে গেলে উপহার হিসেবে বই নিয়ে যেতেন। বাড়ির সদস্যদের শেখাতেন, বইয়ের তুল্য উপহার কিছুই হয় না। সেই শিক্ষাই বুঝি সম্পূর্ণ হল কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগারকে তঁার পুত্রবধূ চৈতালীদেবীর একগুচ্ছ বই–উপহারে।
শুধু বইয়ের সম্ভার বাড়ানোই নয়, গ্রন্থাগারের পাঠক সংখ্যা বাড়াতেও বছরভর নানা কর্মসূচি পালন করে মহকুমা গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ। গ্রন্থাগারের সদস্য হওয়াটাকেও সরলীকরণ করে দেওয়া হয়েছে। পাঠকদের উৎসাহিত করতে ফি বছর সেরা পাঠকদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেরা পাঠকরা গ্রন্থাগারের মানোন্নয়নের জন্য যে সমস্ত সুপরামর্শ দেন, সেগুলিকে শিরোধার্য করে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন মহকুমা গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ।
গ্রন্থাগারের উৎকর্ষের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, প্রত্নদ্রব্য সংগ্রহশালা। এই সংগ্রহশালায় রয়েছে হাজার হাজার বছরের পুরনো নানা প্রত্নদ্রব্য রয়েছে। মহকুমা গ্রন্থাগারের একটি কক্ষে এই প্রত্নদ্রব্যগুলি সংরক্ষিত। গ্রন্থাগার পরিচালন সমিতির সদস্য শিক্ষিকা বীথিকা মুখোপাধ্যায় জানান, ‘গুপ্তযুগ, সেনযুগ, পালযুগের বিভিন্ন  মূল্যবান সংগ্রহ তিনি কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগারে দান করেছেন। ফলে আমাদের গ্রন্থাগারটি সমৃদ্ধ হয়েছে।’

কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগারে বই দেওয়ার পর চৈতালী অধিকারী এবং তঁার কিশোর পুত্র আয়ুষ । ছবি:‌ প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top