অমিতাভ বিশ্বাস, করিমপুর: যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের দেওয়ান বাড়ির দুর্গাপুজোকে ঘিরে আজও মেতে ওঠেন এলাকার মানুষ। ১৫৭৬ সাল, দিল্লির মসনদে মোঘল সম্রাট আকবর। রাজ্য বিস্তারের জন্য তাঁর মোঘল সেনারা দিকে দিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। ছোট ছোট রাজারা বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু বাধ সাধলেন যশোরের (‌অধুনা বাংলাদেশের)‌ স্বাধীন রাজা প্রতাপাদিত্য। এই খবর শুনে চটে লাল হলেন দিল্লির বাদশা। তলব করলেন সেনাপতি মানসিংহকে। আদেশ দিলেন জীবিত বা মৃত যেভাবেই হোক প্রতাপাদিত্যকে ধরতে হবে। গুপ্তচর মারফত এমন খবর পেয়ে চিন্তায় পড়লেন প্রতাপাদিত্য। কেন না যুদ্ধ শুরু হলে তাঁর নাবালক পুত্রের দায়িত্ব কে নেবে। রাজার এই চিন্তার কথা জানতে পেরে দেওয়ান দুর্গারাম চৌধুরি নাবালক ছেলের দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান। এরই মধ্যে মানসিংহ বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে যশোর আক্রমণ করলেন। দুর্গারাম রাজার ছেলেকে নিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে এলেন নদীয়ার ধোড়াদহ গ্রামে। চারিদিকে জল আর ঘনজঙ্গলের মধ্যে নাবালক ছেলেকে নিয়ে থাকতে লাগলেন। যুদ্ধ শেষ হয়েছে শুনে দেওয়ান দুর্গারাম রাজাকে খবর দিলেন তাঁর ছেলে ভাল আছে। ছেলের প্রাণ বাঁচানোর জন্য প্রতাপাদিত্য অত্যন্ত খুশি হয়ে দুর্গারামকে পাঁচটি মহল দান করেন। পাঁচ মহলের একটি মহলের নাম ধোড়াদহ। দেওয়ান থেকে জমিদার হয়ে আনন্দে মেতে উঠেছিলেন। কেন না জঙ্গলে আত্মগোপন করার সময় মা দুর্গার কাছে মানত করেছিলেন সন্তানকে রক্ষা করে নিরাপদে যেন রাজার কাছে পৌঁছে দিতে পারি। তার দেওয়া মানত অনুযায়ী ঘনজঙ্গল পরিষ্কার করে খড়ের চালা ঘরে দুর্গা পুজো শুরু করেন। পরে ১৭৫৩ সালে পাকা দালান করে সেখানে জাঁকজমক করে দুর্গা পুজো শুরু হয়। রীতি মেনে সেই পুজো আজও চলে আসছে। দুর্গারাম চৌধুরির এক বংশধর পুস্পেন চৌধুরি বলেন, ‘‌আমরা বাপ–ঠাকুরদাদার কাছে থেকে শুনেছি চিকের আড়ালে বসে বাড়ির মেয়েরা দুর্গা মন্দিরের পুজো দেখতেন। সাবেকি বাংলাদেশি ঘরানার একচালার দেবী মূর্তির পুজো হত। তখন মায়ের গায়ে থাকত অসংখ্য সোনার গয়না। একশোটি ঢাক বাজত। কামান দেগে শুরু হত সন্ধিপুজো।’‌ বংশ পরম্পরায় এলাকার প্রবীণ শিল্পী দুলাল মালাকারের বংশধরেরাই এখনও এই প্রতিমা তৈরি করেন। নানা রকম মাছের ভোগ দেওয়া হয়। এই পুজো মণ্ডপেই শালগ্রাম শিলা, মা মঙ্গলচণ্ডী ও বানেশ্বরের পুজো হয়। নবমীর দিনে শাক, ন’‌রকমের ভাজা–সহ নানা রকম মিষ্টান্ন পদের  ভোগ হয়। 

প্রতাপাদিত্যের দেওয়ানবাড়ির দুর্গা প্রতিমা। ছবি:‌ রমণী বিশ্বাস
 

জনপ্রিয়

Back To Top