স্বদেশ ভট্টাচার্য, কচুয়াধাম (‌বসিরহাট)‌: ভিড়ের চাপে ভাঙল পাঁচিল। আতঙ্কে পালাতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন ৫ পুণ্যার্থী। বসিরহাটের কচুয়া লোকনাথ মন্দিরের যাওয়ার পথে একটি বাড়ির পাঁচিল পুণ্যার্থীদের ভিড়ে ভেঙে পড়ল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে। আতঙ্কে শুরু হল হুড়োহুড়ি। তারই জেরে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হল ৫ পুণ্যার্থীর। আহত হয়েছেন ৩০ জন। মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে রাত ২টো ১৫ মিনিটে নাগাদ। পুলিশ জানিয়েছে, মৃতেরা হলেন স্বরূপনগরের দত্তপাড়ার বাসিন্দা অপর্ণা সরকার (‌২৮)‌, হাসনাবাদের তরুণ মণ্ডল (‌২৬)‌, এবং রাজারহাটের পূর্ণিমা গড়াই। এ ছাড়াও এসএসকেএম হাসপাতালে মৃত্যু হয় একজন মহিলা ও পুরুষের। তঁাদের নাম, পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তরুণ ও অপর্ণাকে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। আরজি কর হাসপাতালে মারা যান পূর্ণিমা গড়াই। আহত তিন পুণ্যার্থী নীলা সরকার, নমিতা সর্দার এবং টুম্পা বিশ্বাস ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা সঙ্কটজনক। ঘটনা জানার পরেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এসএসকেএম এবং ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের দেখেন। ক্ষতিপূরণের কথাও ঘোষণা করেন। কচুয়ায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন ডিজি বীরেন্দ্র।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছরের মতো এবারেও জন্মাষ্টমী তিথিতে লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আবির্ভাব উৎসব উপলক্ষে ব্যাপক ভিড় হয়েছে কচুয়ায়। কলকাতার কালীঘাট, বাগবাজার,  কুমারটুলি, ব্যারাকপুর, ভাটপাড়ার গঙ্গার ঘাট থেকে এবং বসিরহাটের ইছামতী, বিদ্যাধরী নদীর জল নিয়ে পায়ে হেঁটে কয়েক লক্ষ ভক্ত কচুয়ায় আসেন। ২১ , ২২, ২৩ আগস্ট ৩ দিনের অনুষ্ঠান। মাঝের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ভিড় উপচে পড়েছিল। সন্ধের পর বৃষ্টি শুরু হওয়ায় রাস্তায় পুণ্যার্থীরা আটকে ছিলেন। বৃষ্টি থামার পর একসঙ্গে দর্শনার্থীদের ভিড় আছড়ে পড়ে। কে আগে যাবে এ নিয়ে হুড়োহুড়ি লেগে যায়। স্বরূপনগর মোড় থেকে কচুয়া লোকনাথ মন্দিরে যাওয়ার রাস্তা খুব একটা প্রশস্ত নয়। একটাই রাস্তা দিয়ে ঢোকা ও বেরনো। ভিড়ের চাপে রাস্তার ধারের বিশাল পাকা দেওয়াল ভেঙে পড়ে। তখন মানুষের চাপে অন্যদিকের পুকুরের ওপর পাটতন করে দোকান পসরা বসেছিল।কয়েকটি স্টল ভেঙে পুকুরের মধ্যে পড়ে। বিদ্যুৎবাহী তারও ছিঁড়ে পড়ে।
রাজ্য পুলিশ শুক্রবার সকালেই জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত ২–‌১৫ মিনিটে প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে মেডিক্যাল ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ১০ জন গুরুতর আহতকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। ৩ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। ৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ৫ জনকে বসিরহাট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাজ্য পুলিশের এডিজি দক্ষিণবঙ্গ এবং ডিআইজি প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ ঘটনাস্থলে রয়েছেন।
ঘটনার পর শুক্রবার সকালে কচুয়ায় ছুটে আসেন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, রাজ্য পুলিশের ডিজি বীরেন্দ্র, বসিরহাট পুলিশ জেলার সুপার কঙ্করপ্রসাদ বারুই–সহ প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকরা। ঘটনাস্থল ঘুরে খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, ‘‌খুবই দুঃখজনক ঘটনা।’‌ তবে মন্দির কমিটির গাফিলতির দিকেই আঙুল তুলেছেন জ্যোতিপ্রিয়। মন্ত্রী বলেন, ‘‌জেলার ২টো জায়গায় ভক্তরা আসেন। চাকলায় ও কচুয়ায়। কিন্তু মন্দির একটা ট্রাস্ট চালায়। তারা আমাদের কথা শোনে না। আমাদের সেখানে ঢুকতে দেয় না। আমরা দু জায়গাতেই একাধিকবার বৈঠক করেছি। থানা, বিডিও, এসডিও স্তরে বৈঠক হয়েছে। মন্দির কমিটির সঙ্গেও বসেছি। আমরা বলেছি আপনাদের কী দরকার বলুন। ওনারা কিছু বলেননি। মন্দির কমিটির ভুলেই আজকের এই ঘটনা ঘটেছে। এরপর কচুয়া ও চাকলা দু জায়গাতে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।’‌ 
কচুয়া লোকনাথ মিশন উৎসব কমিটির সহ–‌সভাপতি অলোক দত্ত বলেন, ‘‌একেবারেই অপ্রত্যাশিত ঘটনা। অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তবে যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটা মন্দিরের এলাকা নয়। মন্দিরের বাইরে ঘটেছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখলে বোঝা যাবে। এখান থেকে মন্দির কমিটি কোনও পয়সা তোলে না।’‌ 
হাসনাবাদের আমলানি গ্রাম থেকে বাইকে করে লোকনাথ মন্দিরে গিয়েছিলেন তরুণ মণ্ডল (‌২৬)‌। সঙ্গে ভাই বরুণ ও শ্যালিকার ছেলে রাজকুমার। বাইক রেখে ৩ জন মন্দিরের রাস্তা ধরেন রাত তখন দেড়টা। পদপিষ্ট হয়ে তরুণের মৃত্যু হয়। এই খবর আমলানি গ্রামে পৌঁছয় রাত ৩টেয়। বরুণ বলেন, এত ভিড়ের চাপ আমরা এগোতে পারছিলাম না। দাদা একটু এগিয়ে ছিল। এমন সময় পাঁচিল ভেঙে পড়ে। উল্টোদিকে স্টল ভেঙে পুকুরে বহু মানুষ পড়ে যান। দাদাকে আর খুঁজে পাইনি। একটু ভিড় পাতলা হলে দেখি দাদা পড়ে আছে। ওকে নিয়ে আর ফিরতে পারলাম না। আমলানি মাঝের পাড়া তরুণের শোকে কাতর। এক বছরের মেয়েকে নিয়ে স্ত্রী পিয়া জ্ঞান হারাচ্ছেন। বাবা তপন মণ্ডল শোকে পাথর। বেসরকারি প্যাথলজিকাল ল্যাবের কর্মী তরুণ পরিবারের বড় ভরসা ছিলেন। পাড়ায় অত্যন্ত মিশুকে বলে সবাই তাকে ভালবাসত। তরুণকে হারিয়ে আমলানি গ্রামে জন্মাষ্টমীতে কোনও উৎসব নেই।‌‌

 

কচুয়ার ঘটনাস্থলে মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। তরুণ মণ্ডলের শোকার্ত পরিবার। শুক্রবার। ছবি: স্বদেশ ভট্টাচার্য 

জনপ্রিয়

Back To Top