সম্বৃতা মুখার্জি: ‌‌‌‌‌‌ঝাড়খণ্ডের আরাজু গ্রামের রানিয়া কিস্কুকে ভুলতে বসেছিল তার গ্রামের লোক। সবাই জানতেন মারা গেছেন রানিয়া। কলকাতা থেকে ৪০ বছর পর নিজের গ্রামে তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে হ্যাম রেডিওর ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব।
বিহারের খাগাড়িয়া জেলার অনুপমা কুমারী। রাজস্থানে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন অনুপমা। ঘুরতে ঘুরতে চলে আসেন কাকদ্বীপে। আড়ারিয়া জেলার লক্ষ্মণ শাহ গঙ্গাসাগর মেলায় এসে দলছুট হয়ে বকখালি চলে আসেন। দুজনই আজ বিহারে নিজেদের পরিবারের সঙ্গে রয়েছেন রেডিও ক্লাবের সাহায্যেই। সাগরমেলার সময় প্রায় প্রতিদিন পরিবারের থেকে আলাদা হয়ে যান ৩০০–র বেশি মানুষ। তাঁদের ঘরে ফেরাতে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন রেডিও ক্লাবের সদস্যরা। শুধুমাত্র হাসাপতাল থেকে খবর পেয়েই ৯৪ জনকে ঘরে ফিরিয়ে দিয়েছে এই রেডিও ক্লাব।
প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ছিলেন হ্যাম রেডিওর সদস্য। এটি এখন শুধুমাত্র শখের রেডিও নয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যোগাযোগ তৈরি, হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফেরানোর কাজ করে চলেছে হ্যাম। যোগাযোগের ক্ষেত্রে যখনই সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই হ্যাম রেডিওর কাজ শুরু হয়। এই মুহূর্তে‌ গোটা রাজ্যে হ্যাম রেডিওর শাখা ৬টি।  হ্যাম রেডিওর অন্যতম শাখা, ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব খাতায়–‌কলমে কাজ শুরু করে ২০০৮ সাল থেকে। ‌এখন সদস্য সংখ্যা ২৩৫। তাঁদের ভাষা আন্তর্জাতিক ‘‌কিউ কোড’‌। অ্যামেচার বা হ্যাম রেডিওর কাজের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে সমাজের জন্য কাজ করতে চেয়েছিল ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব। সেই লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা শুরু হয়। হায়দরাবাদের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যামে শখের রেডিও থেকে হ্যাম এখন বিপদের বন্ধু চার রেডিও, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ হ্যামস এবং ত্রিপুরা হ্যাম রেডিও ক্লাবের সঙ্গে মিলিতভাবে সারা দেশে কাজ করে চলেছে তারা। ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীষ নাগ বিশ্বাস বললেন, ‘‌ফণী, আইলা, সুনামির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় রেডিও সেন্টার তৈরি করে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রেখেছেন আমাদের সদস্যরা। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ফোর্সের সঙ্গে মহড়া হয় আমাদের। গত বছর ব্যারাকপুরে ১৪টি ঘাট মিলিয়ে এই মহড়া হয়েছিল।’‌ দেশে নাশকতামূলক ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকলে, অনেক ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে তাঁদের রেডিও সিগন্যালে। কঠিন অসুখের প্রয়োজনীয় ওষুধ বিদেশ থেকে আনার ব্যবস্থাও করেছে। আর এই কাজে নব প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে উৎসাহ দিচ্ছে ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সদস্যরা।  
 রেডিও ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রে যাওয়া মৎস্যজীবীদের নিখোঁজ হওয়ার সংখ্যা কমানো যেতে পারে। তবে সব মৎস্যজীবী জানেন না এর ব্যবহার। তাই মাঝ সমুদ্রে একে–‌অপরকে সাহায্য করতে পারেন না তাঁরা। তাঁদের প্রয়োজনীয় লাইসেন্সও নেই। তাই রেডিও, অ্যান্টেনা দিয়ে মৎস্যজীবীদের এখনও সাহায্য করতে পারছে না এই রেডিও ক্লাব। উপকূল রক্ষীবাহিনীও চাইছে মৎস্যজীবীদের হাতে তাড়াতাড়ি পৌঁছক রেডিও ব্যবহারের যাবতীয় সুবিধা। উল্লেখ্য, ‌মৎস্যজীবীদের রেডিও সিগন্যালের ব্যবহার শেখাতে গিয়েই একসময় নাশকতামূলক চক্রান্তের অনেক কথা ধরা পড়েছিল সিগন্যালে।পর্বতারোহীদেরও বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে সহায়ক হতে পারে রেডিও চালনার প্রশিক্ষণ। ‌কারণ, একমাত্র রেডিও সিগন্যাল পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে কাজ করে। প্রত্যেক অভিযাত্রীর রেডিও সিগন্যাল ব্যবহার শেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সভাপতি সুবীর দত্ত। প্রয়াত পর্বতারোহী দীপঙ্কর ঘোষ ছিলেন হ্যাম রেডিওর সদস্য। এছাড়া ২২ জন পর্বতারোহীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এই রেডিও ক্লাব। গত লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনেও কাজ করেছে এই রেডিও ক্লাব।‌ www.myham.in‌ নামে একটি মিসিং পোর্টালও তৈরি করেছে এই ক্লাব। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top