সঙ্কর্ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: সারা জীবন মনের মণিকোঠায় সযত্নে সাজিয়ে রাখার মতো একটি সোনালি ‌মূহূর্ত উপহার দিল এ বছরের সঙ্গীত মেলা। বুধবার, নজরুল মঞ্চে। তখন প্রায় শেষ লগ্নে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলে উঠলেন, ‘‌এ–‌রকম একটা অনুষ্ঠান সন্ধ্যাদির গান ছাড়া হয় নাকি?‌ কিন্তু সন্ধ্যাদির গলা খারাপ। উনি রাজি হচ্ছেন না।’‌ তার পর দর্শক–‌শ্রোতাদেরই আহ্বান জানালেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে গান গাইবার অনুরোধ করতে। দর্শকদের সমবেত এই অনুরোধ ফেলতে পারলেন না কিংবদন্তি গায়িকা। গেয়ে উঠলেন তাঁর গাওয়া গঙ্গাস্তোত্র ‘‌দেবী সুরেশ্বরী’‌। গাইলেন ‘‌কমললতা’‌ সিনেমায় তাঁর গাওয়া গান ‘‌ও মন, কখন শুরু কখন যে শেষ কে জানে’‌। তাঁর কণ্ঠের জাদুতে তখন মুগ্ধ গোটা নজরুল মঞ্চ। তাঁর কণ্ঠ ও সুরে ধন্য হল এবারের সঙ্গীত মেলা।‌ 
সঙ্গীত মেলার এই শুরুর দিনে নজরুল মঞ্চ ছিল তারায় তারা। ছিলেন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন ও তথ্য–‌সংস্কৃতি দপ্তরের প্রধান সচিব বিবেক কুমার–‌সহ বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীরা। কে নেই!‌‌ ছিলেন কবীর সুমন, শিবাজি চট্টোপাধ্যায়, অরুন্ধতী হোমচৌধুরি, হৈমন্তী শুক্লা, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত, জোজো, সৈকত মিত্র, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, পূর্ণদাস বাউল, মনোময়, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, শান্তনু রায়চৌধুরি, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, অজয় চক্রবর্তী, তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার, দেবজ্যোতি বসু, শুভাপ্রসন্ন, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, জয় গোস্বামী, আবুল বাশার প্রমুখ।
তারও আগে, মঞ্চে যখন উপবিষ্ট সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, তখনই গান গাইতে উঠলেন কৌশিকী চক্রবর্তী। গাইলেন উস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ–‌র সেই বিখ্যাত ঠুংরি ‘‌ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’‌। বললেন, ‘‌এই গান আমি শিখেছি আমার বাবার (‌অজয় চক্রবর্তী)‌‌ কাছ থেকে। তিনি শিখেছিলেন তাঁর ছেলে উস্তাদ মুনাব্বর আলি খাঁ–র কাছ থেকে। আসল গানটা গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। তিনি মঞ্চে উপস্থিত। তাঁর সামনে এই গানটা গাইতে একটু ভয়–‌ভয় করছে। কৌশিকী ধরলেন গান, যোগ দিলেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী ও উস্তাদ রশিদ খান। যেন একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হল। এই তিন শিল্পীর সঙ্গে যোগ দিলেন অভিজিৎ ভট্টাচার্যও।
এদিন সঙ্গীতশিল্পীদের প্রদান করা হল সম্মান। এ বছরের সঙ্গীত–‌সম্মান প্রদান করা হল উস্তাদ রশিদ খান, ডক্টর শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়, দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, বিভা সেনগুপ্ত, সোমলতা আচার্য, রঞ্জনপ্রসাদ, মিতা চ্যাটার্জি, মধুরিমা দত্তচৌধুরি, চন্দন রায়চৌধুরি, মনোজ মুরলী নায়ার, নাজমুল হক, সিদ্ধার্থ চ্যাটার্জি, সন্তোষকুমার বর্মন, রিনা দাস, তারাদেবী মাহাতো, সুবল দাস বৈরাগ্য, লক্ষ্মীরাম মুর্মু, খন্দেকর সুজাব্বর রহমান। সঙ্গীত মহাসম্মান পেলেন গৌতম ঘোষ, পরীক্ষিৎ বালা, জয়া বিশ্বাস, কৌশিকী চক্রবর্তী। আর বিশেষ সঙ্গীত মহাসম্মান পেলেন জিৎ গাঙ্গুলি , অভিজিৎ ভট্টাচার্য, কুমার শানু, ঊষা উত্থুপ।
এদিন অনুষ্ঠান শুরু হয় ডোনা গাঙ্গুলির ‘‌দীক্ষামঞ্জরী’‌র নাচের অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। গান গাইতে এলেন অভিজিৎ ভট্টাচার্য। গাইলেন জিৎ গাঙ্গুলির সেই হিট্‌ গান ‘‌ঢাকের তালে’‌। সঙ্গ দিলেন জিৎ গাঙ্গুলি। ‘‌ঢাকের তালে’‌ গান হবে কিন্তু ঢাক থাকবে না, তা আবার হয় নাকি?‌ তাই ঢাক বাজিয়ে জমিয়ে দিলেন অভিজিৎ ভট্টাচার্য। কুমার শানু গাইলেন, ‘‌কত যে সাগর নদী পেরিয়ে এলাম আমি’‌। কুমার শানু জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন ‘‌আশিকী’‌ ছবির গানের মধ্যে দিয়ে। গাইলেন সে–‌ছবির গানও। শেষ করলেন ‘‌অমর শিল্পী তুমি কিশোরকুমার’‌ দিয়ে। উস্তাদ রশিদ খান গাইলেন ‘‌আও গে কর তুম সপনা’‌। আর তার পরেই এল সেই আনন্দঘন মুহূর্ত। গান গেয়ে উঠলেন গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। যা বাংলার দর্শক ও সঙ্গীতশিল্পীরা বহন করবেন সারা জীবন।

গান মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, জিৎ গাঙ্গুলি, অভিজিৎ ভট্টাচার্য, কুমার শানু ও ঊষা উত্থুপ। নজরুল মঞ্চে, বুধবার। ছবি: সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top