গৌতম মণ্ডল, সুন্দরবন, ৩ জুন- ওঁরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন সুন্দরবনের গ্রামে গ্রামে। বাউল, তরজা, মনসার পালা, রামায়ণ, গাজন, ভাটিয়ালি, মাঝি মল্লার, বনবিবির পালা, টুসু, ভাদু ও করম পরিবেশন করেন। কেউ পুতুলনাচের শিল্পী। সংখ্যাটা প্রায় হাজার। প্রত্যেকেই প্রান্তিক মানুষ। অধিকাংশই দিনমজুর বা ভ্যান চালান। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে অনুষ্ঠান করেন। আমফানে ভিটেমাটি হারিয়েছেন এঁদের একটা বড় অংশ। কুলতলি, পাথরপ্রতিমা, রায়দিঘি, সাগর, গোসাবা ও বাসন্তীর এই লোকশিল্পীদের অনেকেই সরকারি লোকশিল্পীর মর্যাদা পেয়েছেন। মাসিক ভাতাও পান। সরকারি অনুষ্ঠান করলে বাড়তি টাকাও পান। কিন্তু মার্চ মাস থেকে বন্ধ সব। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো নেমে এসেছে আমফান। অনেক শিল্পীর সরঞ্জামেরও ক্ষতি হয়েছে। এখন সরকারি সাহায্যের আশায় দিন গুনছেন ওঁরা।
সাগরের চাঁপাতলা বামুনখালি বিশালক্ষ্মী পুতুল নাট্য সংস্থার তেরো জন মণিপুরি পুতুল নাচ দেখান। বছর কুড়ি আগে ঘোড়ামারা দ্বীপের মানিক মণ্ডল এই দলটি তৈরি করেছিলেন। তিনিই শিক্ষাগুরু। খড়, বাঁশ, মাটি, কাঠ দিয়ে তৈরি পুতুলের নাচের শো করার ডাক পান বিভিন্ন পুজো পার্বণে । প্রতি শোয়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। মাসে তিন থেকে চারটি শো । কিন্তু সব বন্ধ। চৈত্র–‌বৈশাখের মেলা চলে গেছে। আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েছেন। দিনমজুরিও বন্ধ। আমফানও তছনছ করে দিয়ে গেছে এঁদের। সুদর্শন দাস, রবীন দাস, গোপাল দাস, ভাস্কর মণ্ডল, দীপক আদক, অচিন্ত্য দাস, গিরিধারী দাস, কানাইলাল তেওয়ারিদের বাড়ির চাল উড়ে গেছে। পুকুরের মাছ মরেছে।  লন্ডভন্ড হয়ে গেছে সংসার। নাচের সরঞ্জামও নষ্ট। দলের পান্ডা মধ্য–সত্তরের কানাইলাল তেওয়ারি ভাঙা বাড়ির চাল সারাতে সারাতে জানালেন, ‘‌ এমন ভয়ঙ্কর ঝড় দেখিনি। সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেছে।’‌ ‘পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী লোক শিল্পী সঙ্ঘ’‌ জেলার শিল্পীদের সংগঠন। তারা লোকশিল্পীদের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করছে। কিন্তু সব শিল্পীর সঙ্গে এখনও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। সংগঠনের শিশির হালদার জানান, ‘‌এই শিল্পীরা পরম্পরায় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করে চলেছেন। অথচ করোনা ও আমফানের জোড়া ধাক্কায় এখন দিশেহারা।’‌‌

সাগরের পুতুল নাচের শিল্পী। ছবি:‌ প্রতিবেদক 

জনপ্রিয়

Back To Top