বিভাস ভট্টাচার্য: জনশ্রুতি ছিল, এই কেন্দ্রে বামেরা যদি একটা বাচ্চা ছেলেকেও দাঁড় করায় তাহলেও অনায়াসেই জয় আসবে। উত্তর ২৪ পরগণার এই কেন্দ্রের নাম কামারহাটি। বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবে যার আত্মপ্রকাশ ১৯৬৭-‌তে। প্রথমবারের বিধায়ক ছিলেন সিপিএমের রাধিকারঞ্জন ব্যানার্জি। ১৯৭২-র নির্বাচন বাদে ১৯৮৭ পর্যন্ত রাধিকারঞ্জন একটানা এই কেন্দ্রে জয়ী হন। এরপর ১৯৯১ এবং ১৯৯৬-‌এ জয়ী হন সিপিএমের শান্তি ঘটক। ২০০১ এবং ২০০৬-‌এ জয়ী হন মানস মুখার্জি। তিনিও সিপিএম প্রার্থী। ততদিনে রাজ্য জুড়ে মমতা ব্যানার্জিকে সামনে রেখে তৈরি হয়েছে তীব্র বামবিরোধী হাওয়া। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই কেন্দ্রে ২০১১-‌তে  সিপিএমের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় মমতার দীর্ঘদিনের সঙ্গী মদন মিত্রকে এবং সেখান থেকে মদন জয়ী হন ২৪,৩৫৪ ভোটে। 

কিন্তু ২০১৬তে ফের মদনকে হারিয়ে জয়ী হন মানস। সেই সময় তিনি ছিলেন জেলবন্দি। হারের ব্যাখ্যায় মদনের যুক্তি, মাঠে নেমে তিনি দলকে নেতৃত্ব দিতে পারেননি। তাই এই পরাজয়। এবার? মদনের দাবি ‘‌অন্তত ৬০ শতাংশ ভোট পাব। হালে পানি পাবে না প্রতিপক্ষ।’‌ উল্লেখ্য, সেই বছর সংশোধনাগারে থেকেই কামারহাটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মদন। 
শিল্পাঞ্চল হিসেবে কামারহাটির পরিচয় আছে বা ছিল। বেনী ইঞ্জিনিয়ারিং, ইন্ডিয়া ফয়েলস, উইমকো সহ নামী-দামী কারখানার দরজা দিয়ে একসময় হাসিমুখে ‌যাতায়াত করতেন শ্রমিকরা। জুটমিলের সাইরেনের সঙ্গে ঘড়ি মেলাতেন এখানকার বাসিন্দারা। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক কারখানা। তৃণমূলের অভিযোগ, এলাকার বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়েছে সিপিএম আমলে। পাল্টা সিপিএমের দাবি, কারখানা তৃণমূলের আমলেও বন্ধ হয়েছে। 
এখানে এবার বিজেপির প্রার্থী অনিন্দ্য ওরফে রাজু ব্যানার্জি। তাঁর অভিযোগ, এখানে তৈরি হয়েছে গুন্ডারাজ, সিন্ডিকেট। বন্ধ কারখানার জমিতে তোলা হচ্ছে বহুতল। রাজুর দাবি, জেতার পর তাঁর প্রথম কাজ হবে এলাকায় শিল্পস্থাপন। আধুনিক ব্যবস্থা চালু করে জুটমিলের উন্নতিসাধন। পাল্টা তৃণমূলের পক্ষে দাবি করা হয়, ইন্ডিয়া ফয়েলস যখন বন্ধ হয়, তখন দিনের পর দিন মদন মিত্র এই কারখানার শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান। প্রতিটি পরিবারের খাওয়ার ব্যবস্থা করা ছাড়াও চিকিৎসা-সহ সমস্ত প্রয়োজনে নিরলসভাবে এগিয়ে এসেছিলেন। বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের আর্থিক প্যাকেজের জন্য দিনের পর দিন লড়াই চালিয়ে গেছেন। চেষ্টা চালাচ্ছেন কারখানা ফের খোলার। পাল্টা দাবিতে এখানকার এবারের সিপিএম প্রার্থী সায়নদীপ মিত্র বলেন, ইন্ডিয়া ফয়েলসের শ্রমিকরা কেউ ‘‌বেনিফিট’‌ পাচ্ছেন না। এলাকার পৌর পরিষেবার মান খুবই নিচু। স্বজনপোষন আর দুর্নীতিতে ভরে গেছে কামারহাটি। লোকে এর থেকে রেহাই পেতে চাইছে। 
২০১৬-‌তে মদন হেরে যান মানস মুখার্জির কাছে। আবার ২০১৯-‌এ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের সৌগত রায় এই কেন্দ্রে এগিয়ে ছিলেন। মদনের দাবি, যেহেতু ভোটে তিনি এলাকায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি তাই ২০১৬-‌তে ফাঁকা মাঠে খেলে বেরিয়ে গেছে সিপিএম। মদনের ভাষায়, খেলোয়াড় থাকলেও মাঠে ‘‌ক্যাপ্টেন’‌ না থাকায় হার হয়েছিল।

কিন্তু এলাকার স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে অন্যান্য পরিষেবা? তৃণমূল প্রার্থীর দাবি, তিনি বিধায়ক থাকাকালীন যেভাবে উন্নতি করেছেন সেই তুলনায় গত পাঁচ বছরে মানস মুখার্জি কিছুই করতে পারেননি। কামারহাটিতে একটা কথা চালু আছে, যে কোনও রাজনৈতিক দলের হোন না কেন, প্রয়োজনে মদন মিত্রর কাছে গেলে তিনি কখনই ফেরান না। এই জনপ্রিয়তা মদনের একটা প্লাসপয়েন্ট। এলাকার প্রতিটি ক্লাবের সঙ্গে তাঁর নিবির যোগাযোগ। রাজুর অভিযোগ, ক্লাবগুলি দখল করে রেখেছে তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনী। অরাজনৈতিক সংগঠনকে করে তুলেছে রাজনৈতিক কলকারখানার আখড়া।

এলাকার সংখ্যালঘু ভোট প্রায় ২৬ শতাংশ। এই ভোটটা কাদের পক্ষে যাবে? তৃণমূল আশাবাদী, এই ভোট ঢুকবে তাদের বাক্সে। সায়নদীপের দাবি, ২০১৯-‌এ বিজেপির ভয়েই সংখ্যালঘুরা তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিলেন। তাঁরা এবার বুঝতে পেরেছেন তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। ফলে এবার আর তৃণমূল এই ভোট পাবে না। রাজু বলেন, একটা ভুল ধারণা আছে সংখ্যালঘু ভোট বিজেপির সঙ্গে নেই। তাহলে উত্তরপ্রদেশ বা অন্যান্য সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রাজ্যে বিজেপি জিতছে কীভাবে? 
প্রচারের শেষ দিনে হনুমান চালিশা বিলি করেছেন রাজু। মদনের অভিযোগ, ভাত, রুটি আর বাসস্থানের বদলে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছে বিজেপি। সায়নদীপের ঠাট্টা, কীভাবে উন্নতি করব সেটা নিয়ে তো কিছু বলতে পারছে না, তাই ধর্মকে হাতিয়ার করে এগোনোর চেষ্টা। রাজুর দাবি, বেশ করেছি। এই সরকার একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের সরকার। সরকারের এক মন্ত্রী বলেছেন খিদিরপুর, মোমিনপুর হল মিনি পাকিস্তান।
শিল্পের সঙ্গে পৌর ও স্বাস্ব্য ব্যবস্থার উন্নতি। নরেন্দ্র মোদির সবকা সাথ সবকা বিকাশ স্লোগান নাকি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মমতার প্রকল্প বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্লোগান, কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ।‌ কোন পথে হাঁটবেন কামারহাটির ভোটাররা? ১৭ এপ্রিল নির্বাচন। উত্তর মিলবে ২মে।
 

Back To Top