রিনা ভট্টাচার্য: লকডাউনের মধ্যেই আরও কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বিড়িশিল্প, ফুলবাজার, পানবাজার খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। নবান্নে মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌লকডাউনের কারণে বহু মানুষ কষ্টে আছেন। উপার্জনের রাস্তা বন্ধ। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছে। যাতে মানুষ উপার্জন করতে পারেন।’‌
ফুলের বাজার বৃহস্পতিবার থেকেই চালু করা হবে। তবে বুধবার থেকে নিজের নিজের এলাকায় ফুল বিক্রি করতে পারবেন চাষিরা। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌প্রচুর মানুষ ফুলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে হাওড়া, হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মেদিনীপুর, সুন্দরবন এলাকায় প্রচুর ফুল চাষ হয়। লকডাউনের জন্য সেই সব ফুল নষ্ট হয়েছে। তাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে সমস্ত সতর্কতা মেনেই কাজ করতে হবে। দেখতে হবে যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়।’‌
বিড়িশিল্পের সঙ্গে হাজার হাজার পরিবার জড়িত। তাই ঘরে, দোকানে বসে বিড়ি বাঁধার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হল। তবে একসঙ্গে ৭ জনের বেশি কাজ করা যাবে না। প্রত্যেক শ্রমিককে ২ মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। বড় ব্যবসায়ীদের একজন করে এজেন্ট এসে এই বিড়ি সংগ্রহ করে নিয়ে যাবেন। একসঙ্গে একাধিক মানুষ আসতে পারবেন না। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘একসঙ্গে ‌অনেক মানুষকে কাজ করার অনুমতি দিতে পারব না। সতর্কতা মেনে কাজ করার শর্তে বিড়িশিল্পে ছাড় দেওয়া হল।’‌
ঘরে বসে পানচাষিদের পান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই সবজির সঙ্গে পানও যাতে বাজারে আসে তার নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে পানের দোকান খোলা রাখা যাবে না। তিনি বলেন, ‘‌পানের দোকানে অনেক মানুষ ভিড় করে দাঁড়াবেন তা হবে না। বাড়িতে পানপাতা এনে সেজে খান। সবজির সঙ্গে পানপাতা বিক্রি করা যাবে।’‌ মুখ্যমন্ত্রী এদিন ফের স্পষ্ট করে দেন, কৃষি মান্ডি খোলা থাকবে। কৃষিজাত সব পণ্য যাতে সুষ্ঠুভাবে বাজারে নিয়ে আসা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে ডিজি বীরেন্দ্রকে আরও একবার বলেন, এইসব পণ্য বাজারে আনার ক্ষেত্রে যেন কোনওরকম সমস্যা না হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌কাঁচা সবজি মজুত করে রাখা যায় না। নষ্ট হয়ে যায়। তাই কৃষকদের সাহায্য করার জন্য সর্বত্র সবজি বাজার চালু থাকবে। তবে গ্রামে–গঞ্জে, হাটে–বাজারে যাঁরা একসঙ্গে বসে সবজি বিক্রি করছেন তাঁরা দয়া করে সতর্ক হোন। আমরা দ্বিতীয় পর্যায়ে আছি। যাতে আর না বাড়ে তা আমাদের দেখতে হবে। মাস্ক না পেলে বাড়ির মা–বোনেদের শাড়ি থেকে রুমালের মতো তৈরি করে মুখে বাঁধুন। মোবাইল কাউকে দেবেন না। আপনার মোবাইলে অন্য কেউ কথা বললে টিস্যু পেপার দিয়ে ভাল করে স্যানিটাইজড করে নিন।’‌
মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, ‘‌রাজ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৬৯। একদিনে ৮ জন বেড়েছে। তবে তার জন্য ৬০ জনই ৯টি পরিবারের সদস্য। পারিবারিক আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।’‌ তাই মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শ, সবাই একসঙ্গে থাকলেও দূরত্ব বজায় রাখুন। মাস্ক ব্যবহার করুন। বারবার হাত ধোবেন। কমিউনিটির মধ্যে যাতে না ছড়ায় সেদিকে নজর রাখতে হবে।‌ রাজ্য সরকারের তরফে সাতটি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জায়গাগুলিতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। প্রশাসনের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এই জায়গাগুলি থেকে বাইরে যাতে সংক্রমণ না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। পরিকল্পনা করা হয়েছে লক্ষ্মণরেখা টেনে ওই জায়গার মধ্যেই সংক্রমণ সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। মুখ্য সচিব রাজীব সিনহাকে পাশে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এদিন একটি মানচিত্র দেখান। তিনি বলেন, ‘‌আমাদের রাজ্যের এই ছোট ছোট জায়গাগুলিতেই করোনা সংক্রমণ সীমাবদ্ধ আছে। যাতে আর না ছড়ায় তার জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’‌ উত্তরবঙ্গে কালিম্পং ছাড়া আর কোনও জায়গার নাম তিনি বলতে চাননি। তিনি চান না কোনও জায়গায় আতঙ্ক ছড়াক। এদিন তিনি করোনায় মৃতের সংখ্যা ৩ থেকে বেড়ে ৫ হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, বিশেষজ্ঞ কমিটি আরও ২ জনের মৃত্যুর কারণ ‘‌করোনা’‌ বলেই নিশ্চিত করেছেন।
করোনা চিকিৎসার জন্য ওষুধের কোনও অভাব নেই। প্রয়োজনে আরও ওষুধ মজুত রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌কেন্দ্রীয় সরকার আমেরিকাকে ওষুধ দেবে কি না এটা তাদের ব্যাপার। তবে আমাদের রাজ্যে ওষুধের কোনও অভাব নেই।’‌
রাজ্যবাসীর কাছে মুখ্যমন্ত্রী এদিন আবেদন করেছেন, সামনে শবে বরাত, নববর্ষ আছে। প্রত্যেকের কাছে তাঁর অনুরোধ, ‘‌ঘরে বসে প্রার্থনা করুন। উৎসব পালন করুন। সরকার যা করছে আপানাদের ভালর জন্য করছে। লকডাউন উঠবে কি না আমি জানি না। যদি উঠেও যায়, তখন ট্রেন চলতে শুরু করবে। এ রাজ্যে প্রচুর মানুষ আসবেন। পরিযায়ী শ্রমিকেরাও আসবেন। তখন আবার একটা সঙ্কটের মুখে পড়তে হবে। তাই সবার ভালর জন্য, বাইরে থেকে আগতদের সেফ হাউসে রাখা হবে। আমি নাম রেখেছি ‘‌‌আমার নিজের ঘর’‌। যাতে পরিবারের মধ্যে সংক্রমণ না ছড়ায় তার পরিকল্পনা প্রশাসন করছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে এদিন মমতা বলেন, ‘‌ব্যাঙ্ক এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক জিরো ব্যালান্সে অ্যাকাউন্ট খোলার নাম করে এবং গ্যাস দেওয়ার নাম করে গ্রামেগঞ্জে হাজার হাজার মানুষকে একসঙ্গে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার নিজে লকডাউন ঘোষণা করে নিজেই লকডাউন ভাঙছে। এটা আমরা একেবারেই ভালভাবে নিইনি। যথাযথ জায়গায় অভিযোগ জানাব।’‌ তিনি জানান, রেশন দোকানে মানুষ ভিড় করছিলেন। সেই ভিড় ঠেকাতে প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে। রেশন কার্ড যাঁদের আছে তাঁরা প্রত্যেকেই চাল, আটা পাবেন। কেউ আটা নিতে না চাইলে তার পরিবর্তে চাল পাবেন। যাঁরা ২ টাকা কিলো দরে চাল পান, তাঁদের খাদ্যশস্য ৬ মাস বিনামূল্যে দেওয়া হবে। পরে ১ কিলো করে ডালও দেওয়া হবে। 

অনেকে রেশন দোকান থেকে চাল নেন না। কিন্তু এখন তাঁরা চাল চাইছেন। তাঁদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী ‌বলেন, যাঁরা সত্যিই গরিব তাঁরা অবশ্যই চাল পাবেন। রেশন কার্ড না থাকলেও ব্যবস্থা করা হবে। মহকুমা শাসক এবং বিডিও–দের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কেউ অনাহারে থাকবেন না। কিন্তু তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‌এই সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে কেউ নিজের পকেট ভরানোর চেষ্টা করবেন না।’‌
রেশন ডিলারদের প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ, যাঁরা রেশন নিতে আসছেন তাঁদের বিভ্রান্ত করা যাবে না। খারাপ মানের চাল দেওয়া যাবে না। প্রত্যেককে তাঁর প্রাপ্য খাদ্যশস্য দিতে হবে। মানুষের আস্থা রেশন ডিলারদের অর্জন করতে হবে। মানুষের সঙ্গে সহানুভূতিপূর্ণ এবং মানবিক আচরণ করতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এদিন অভিযোগ তোলেন, ‘‌একটি রাজনৈতিক দল এই সময় রাজনীতি করছে। উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ঘোলা জলে কেউ মাছ ধরার চেষ্টা করবেন না। এটা পরস্পরকে দোষারোপের সময় নয়। গুজব ছাড়াবেন না। একটা নতুন অসুখ এসেছে। সবাইকে এই অসুখের মোকাবিলা করতে হবে। সেই কাজ করাই এখন একমাত্র লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘‌কেউ কেউ সাহায্য করার নাম করে রেশন ডিলারদের বিরক্ত করছেন। রেশন থেকে চাল নিয়ে পাড়ার মানুষকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সাহায্য করার হলে নিজের পকেট থেকে খরচ করুন। অথবা অন্যভাবে করুন। রেশন ডিলারদের বিরক্ত করবেন না। রেশন থেকে যা দেওয়ার সরকার দেবে।’‌ তিনি জানান, তাঁর দলও সাহায্য করছে। কিন্তু নিজেদের খরচায়। যাঁরা জরুরি ত্রাণ তহবিলে সাহায্য করছেন তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌আমার কাছে পয়সা নেই। আপনাদের অর্থেই আমরা কিট কিনছি, মাস্ক কিনছি। সুতরাং যাঁদের যতটুকু ক্ষমতা সেটা নিয়েই তাঁরা এগিয়ে আসুন।’‌
এ রাজ্য থেকে ৪৯ জন শ্রমিক তামিলনাড়ুতে কাজ করতে গিয়েছিলেন। তারপর তাঁরা সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে গিয়ে একটা জঙ্গলে ঢুকে পড়েছিলেন। ৪–৫ দিন তাঁদের কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি। প্রশাসনিক স্তরে যোগাযোগ করে জানা গেছে, তাঁরা একটি ত্রাণ শিবিরে আছেন, সুস্থ আছেন। মুখ্যমন্ত্রী এদিন মুখ্য সচিব রাজীব সিনহাকে ক্যাবিনেট সচিবের সঙ্গে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের বিষয়ে আলোচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ র‌য়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের খাওয়া, থাকা, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী এ ব্যাপারে ১৮টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন। তারপরেও কোথাও কোথাও সমস্যা হচ্ছে। তাই মুখ্য সচিবকে আমি বলেছি, যাতে ওই শ্রমিকেরা কোনও সমস্যায় না পড়েন তার ব্যবস্থা যেন কেন্দ্রীয় সরকার করে।

জনপ্রিয়

Back To Top