শিখর কর্মকার: করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় লকডাউনের জেরে সিঁদুরে মেঘ দেখা দিয়েছে আসন্ন শারদোৎসবের আকাশে। সম্ভাব্য আর্থিক সঙ্কটের কথা মাথায় রেখে ইতিমধ্যে পুজো ছোট করে আনার কথা ভাবতে শুরু করেছে কলকাতার বেশ কয়েকটি দুর্গাপুজো কমিটি। কোনও কোনও পুজো কমিটি থিম বা শিল্পী বদল করে খরচ সামাল দেওয়ার কথা ভাবছে। এমনকী লকডাউন দীর্ঘস্থায়ী হলে ঘটপুজোর মাধ্যমে এবারের দুর্গাপুজো সারতে হতে পারে বলে পুজোকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন। 
কলকাতায় দুর্গাপুজো শুধু উৎসব নয়, এক শিল্পও বটে। এই পুজোকে ঘিরে বিরাট অঙ্কের ব্যবসা হয় সারা বাংলায়। শুধু বাংলা নয়, সারা দেশের বহু ব্যবসায়ী যুক্ত হন এর সঙ্গে। দুর্গাপুজোর কাজে যুক্ত হয়ে বহু খেটে খাওয়া মানুষ রোজগারের পথ পান। লকডাউন এ সবের ওপর যে প্রভাব ফেলবে তা এক বাক্যে স্বীকার করে নিচ্ছেন ছোট–মাঝারি–বড় সব ধরনের পুজো কমিটির কর্তারা। অবস্থা যাই হোক না কেন, কলকাতার এবারের দু্র্গাপুজোর জৌলুস যে অনেকটাই কমবে সে–বিষয়ে নিশ্চিত প্রায় সব পুজোকর্তাই। তার রেশ পরের বছরও থাকবে বলে ধারণা তাঁদের। মার্চ মাসের শেষে লকডাউন ঘোষণার পর সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো কিংবা দুঃস্থদের সেবার কাজে নেমে পড়েছেন শহরের কয়েকটি পুজো কমিটির সদস্যরা। মুখ্যমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশেষ ত্রাণ তহবিলে মুদিয়ালি, সুরুচি সঙ্ঘ, কাশী বোস লেনের মতো বেশ কয়েকটি দুর্গাপুজো কমিটি আর্থিক সাহায্য পাঠিয়েছে। ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের তরফেও অর্থসাহায্য করা হয়েছে। পুজোর খরচ কমিয়ে এ ধরনের কাজে আরও বেশি করে ঝাঁপাতে চায় পুজো কমিটিগুলো। 
শহর কলকাতার অধিকাংশ দুর্গাপুজো এখন পুরোপুরি স্পনসর–নির্ভর। টানা লকডাউনে সারা দেশ থমকে গেছে। এ অবস্থায় এ বছর দুর্গাপুজোর স্পনসর পাওয়ার বিষয়ে সমস্যা হবে ধরে নিয়ে ইতিমধ্যে নামী শিল্পীর বদলে ক্লাব সদস্যদের দিয়ে মণ্ডপ গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুদিয়ালি ক্লাব। এই পুজো কমিটির সম্পাদক মনোজ সাহু জানান, সমাজসেবা এই ক্লাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সে কাজ বন্ধ করা সম্ভব নয়। বংশপরম্পরায় প্রতিমা গড়েন চন্দননগরের শিল্পী। তা বদলানো সম্ভব নয়। নিরাপত্তার কারণে আলো কমানো যাবে না। একমাত্র মণ্ডপসজ্জার জন্য মোটা খরচ কমানো সম্ভব। তাই আমরা ঠিক করেছি, নামী শিল্পীর বদলে নিজেরাই এ বছর দুর্গামণ্ডপ গড়ব।’‌ তিনি জানান, নিজেদের গড়া মণ্ডপের জন্য আগে একাধিক বার এশিয়ান পেইন্টসের সম্মান পেয়েছেন তাঁরা। 
দক্ষিণ কলকাতার নামী ক্লাব ত্রিধারা সম্মিলনীর কর্তা কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার জানান, ‘‌করোনার কারণে এ বছর অন্নপূর্ণা ও বাসন্তী পুজো হয়নি। রামনবমী কোনওরকমে হয়েছে। শহরের ছোট–বড় কালীমন্দিরগুলো বন্ধ। আগামী দিনে করোনা পরিস্থিতি কোন অবস্থায় দাঁড়াবে তা জানা নেই। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এটুকু বলা যায়, করোনার কারণে এবার পুজো ছোট হবে। ত্রিধারার মতো দেশপ্রিয় পার্কের পুজোতেও থাকবে না কোনও বৈভবের প্রকাশ।’‌ বালিগঞ্জ কালচারালের কর্তা অঞ্জন উকিল জানান, গতবছরের বকেয়া মিটিয়ে আগের মতো দুর্গাপুজো করার কোনও সম্ভাবনা এ বছর থাকবে না। বাজেট কমাতেই হবে। শিবমন্দিরের কর্তা পার্থ ঘোষের ধারণা, স্পনসরের অভাবে এবার সদস্যদের নিজেদের পকেটের পয়সায় পুজো করতে হবে। ইতিমধ্যে বাজেট কমানোর জন্য এই পুজোর থিমশিল্পীকে বলা হয়েছে। ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের সভাপতি ও বোসপুকুর শীতলা মন্দিরের কর্তা কাজল সরকারের মতে, করোনা পরিস্থিতির জেরে স্পনসরের অভাবে কলকাতার অধিকাংশ মাঝারি ও ছোট পুজোর অবস্থা এ বছর খুবই খারাপ হবে। বাজেট কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন উত্তর কলকাতার কাশী বোস লেন পুজো কমিটির সম্পাদক সোমেন দত্ত। হাতিবাগান সর্বজনীনের কর্তা শাশ্বত বসুর মতে, চলতি লকডাউন ২১ দিন পর উঠে গেলে সামলে ওঠা যাবে। কিন্তু লকডাউন দীর্ঘায়িত হলে দুর্গাপুজোর হাল খারাপ হতে বাধ্য। সুরুচি সঙ্ঘের সভাপতি রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস কিংবা নাকতলা উদয়ন সঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্ত এখনই পুজো নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ। তবে এই দুই পুজোর দায়িত্ব নেওয়া শিল্পী ভবতোষ সুতারের মতে, এ বছর দু্র্গাপুজো ছোট হওয়া উচিত, বদলে যেতে পারে থিম। বেশি সংখ্যক হাতের কাজ করা মানুষকে পুজোর সঙ্গে যুক্ত করে তাঁদের কিছু উপার্জনের সুযোগ করে দেওয়া দরকার। তিনি এই অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চান। তাঁর কথায়, ‘‌এ বছর শিল্পীদের কাছে কম বাজেটে ভাল কাজ করার পরীক্ষা।’ শিল্পী সুশান্ত পালও এই অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চান। তিনিও জানান, ‌করোনার কারণে বাজেট কমলে, সেই অবস্থাতেই ভাল কাজ করার চেষ্টা করবেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু এ বছর নয়, আগামী আরও দু’‌বছর দুর্গাপুজোতেও করোনার প্রভাব দেখা যেতে পারে। শিল্পী সনাতন দিন্দার মতে, এ বছর ঘটা করে দুর্গাপুজো করা মানে বিলাসিতা। আগে মানুষ বাঁচুক, সভ্যতা বাঁচুক, তারপর শারদোৎসবে মেতে ওঠার কথা ভাবা উচিত বাঙালির। থিমশিল্পী গৌরাঙ্গ কুইল্যা অবশ্য মনে করেন, লকডাউন দু’‌মাস পর্যন্ত টানলে তার প্রভাব পড়বে না কলকাতার দুর্গাপুজোয়। কিন্তু তা আরও বাড়লে, দুর্গাপুজো ছোট হতে বাধ্য।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top