চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, দাঁইহাট (কাটোয়া): জানবাজারের রানি রাসমণির অনুরোধে দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী কালীমূর্তি বানিয়েছিলেন নবীন ভাস্কর। ১৮৫৫ সালের কথা। কাটোয়ার ভাগীরথী ঘেঁষা দঁাইহাটের বাসিন্দা নবীনের তখন বয়স মোটে ২০। পাথরের এই কালীমূর্তি বানিয়ে তরুণ শিল্পী নবীন বাংলার শিল্পরসিকদের নজর কাড়েন। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি নবীনকে। অখণ্ড ভারতের বিভিন্ন রাজপরিবার, নানা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে মূর্তি গড়ার ডাক আসতে থাকে নবীনের কাছে। দেশের সেরা ভাস্করের তকমা পান নবীন।
সেই নবীন এবার স্বীকৃতি পাচ্ছেন তঁার জন্মভিটেয়। দঁাইহাট শহরের ভাস্কর পাড়ায় নবীনের আবক্ষ মূর্তি বসাল তৃণমূল শাসিত দঁাইহাট পুরসভা। সোমবার এই মূর্তি বসানো হয়। পুরপ্রধান শিশির মণ্ডল বললেন, ‘নবীন ভাস্কর আমাদের অহঙ্কার। তঁার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে আমরা বাংলার লুপ্তপ্রায় ভাস্কর্য শিল্পকেও সম্মান জানাচ্ছি।’এই মূর্তিটি বানিয়েছেন দঁাইহাট শহরেরই ভাউসিং এলাকার বাসিন্দা কৃতী শিল্পী দেবাশিস চন্দ্র। ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে ফাইবার গ্লাস দিয়ে নিজের স্টুডিওতে প্রায় ৬ মাসের পরিশ্রমে এই মূর্তিটি বানিয়েছেন দেবাশিসবাবু। তিনি বললেন, ‘নবীন ভাস্করের হাত ধরেই দঁাইহাটের ভাস্কর্য শিল্প প্রসার লাভ করেছিল। তঁার মূর্তি বানানোর দায়িত্ব পাওয়ায় আমি ধন্য।’ শুধু দেবাশিসবাবুই নয়, পুরসভার নবীন ভাস্করের মূর্তি বসানোর সিদ্ধান্তকে তামাম দঁাইহাটবাসীও ধন্য ধন্য করছেন।
কাটোয়া মহকুমার প্রাচীন ইতিহাস গবেষক রণদেব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘রাসমণি–রামকৃষ্ণর আরাধ্য ভবতারিণীর মূর্তি গড়ে নবীন ভাস্কর শুধু শিল্পকৃতিরই স্বাক্ষর রাখেননি, ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধেও শিরদঁাড়া সোজা করে দঁাড়িয়েছিলেন। কারণ ব্রাহ্মণ সমাজের একটা বড় অংশ চাননি, শূদ্রের ঘরণীর ঘরে কালীমূ্র্তি প্রতিষ্ঠা হোক। ব্রাহ্মণদের নিষেধ উপেক্ষা করেই নবীন রানি রাসমণির অনুরোধ রেখেছিলেন।’ ১৮৩৫ সালে দঁাইহাটের ভাস্করপাড়ায় জন্ম নবীনের। বাবা রামধন ভাস্করের পাথরের আসবাব ও মূর্তি বিক্রির দোকান ছিল কলকাতায়। সেই ‘ওরিয়েন্টাল স্টোন ওয়ার্কস’ দোকান থেকেই শিল্পের হাতেখড়ি নবীনের। বাবার কাছে কাজ শিখে গোটা ভারতের বিভিন্ন জায়গায়, অধুনা বাংলাদেশের রংপুর, নাটোর ও দিনাজপুরের এবং নেপালের রাজাদের গৃহদেবতা ও মন্দিরের মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন নবীন।
বর্ধমান রাজ পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় মঙ্গলকোটের সতীপীঠ ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা মূর্তি তৈরি করেছিলেন নবীন। নির্মাণের জন্য ভাল পাথরের প্রয়োজন মেটাতে আস্ত একটা পাহাড়ই কিনে ফেলেছিলেন নবীন। এহেন শিল্পীকে সম্মান জানানোর খবর ছড়াতে শিল্পমহলে খুশির ছোঁয়া। তবে নবীন ভাস্করের বর্তমান প্রজন্ম তো বটেই ভাস্কর্য শিল্পের জন্য এককালের বিখ্যাত দঁাইহাট ভাস্কর্য শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়েছে।

জনপ্রিয়

Back To Top