দিব্যেন্দু ভৌমিক, কোচবিহার: পুজোর মতোই গরিমাময় কোচবিহার রাজ পরিবারের ‘‌বড়দেবী’র বিসর্জন পর্বও। মঙ্গলবার দশমীতে কুড়ুল দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে মায়ের মূর্তি ভাসিয়ে দেওয়া হল যমুণা দিঘির জলে।‌ বড়দেবী–র মূর্তি থেকে কেটে জয়া ও বিজয়াকে আলাদা করা হয়। ভাসিয়ে দেওয়া হয় জলে। এরপর টুকরো টুকরো করে কেটে বার করে আনা হয় অসুরকে। ময়না কাঠের কাঠামো থেকে আলাদা করা হয় বড়দেবীকে। মায়ের পায়ে হাল্কা ভাবে কুরুল ছুঁইয়ে মাকে দীঘির জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। চারিদিকে বেজে ওঠে শাঁখ। শুরু হয় উলুধ্বনী। 
বড়দেবীর বিশেষ দশমী পুজো ও ভাসান দেখতে বিজয়া দশমীর কাকভোর থেকেই ভিড় জমে কোচবিহারের যমুনা দীঘির পাড়ে। শুধু কোচবিহার নয়, অসম থেকেও প্রচুর মানুষ আসেন পাঁচশো বছরের রাজ ঐতিহ্যবাহী বড়দেবীর বিসর্জন পর্বে অংশ নিতে।
পঁাচশো বছরের পুরনো প্রথা মেনে দশমীর পুজো, অঞ্জলি ও মায়ের বিসর্জন এসবই হয়ে যায় বিজয়া দশমীর সকালেই। হাল আমলে যোগ হয়েছে সিঁদুর খেলা। পাঁচশো বছর আগে কোচবিহারের মহারাজা নর নারায়ণের স্বপ্নাদেশে পাওয়া বড়দেবী পুজিত হয়ে আসছেন দেবীবাড়িতে। মা এখানে রক্তবর্ণা। মায়ের সঙ্গে থাকেন নেই কার্ত্তিক–গণেশ বা লক্ষ্মী–সরস্বতী। মায়ের সঙ্গে শুধু আসেন দুই সখী জয়া ও বিজয়া। জেলা শাসকের সভাপতিত্বে ‘‌কোচবিহার দেবোত্তর ট্রাস্ট বোর্ড’‌ পরিচালিত রাজ আমলের এই পুজোর আচারের ভিন্নতার পাশাপশি ভিন্নতা রয়েছে বিসর্জনেও। সবই হয় রাজ প্রথা মেনে। পুজোর সমস্ত পর্বে যোগ দেন জেলাশাসক ও রাজ প্রতিনিধি তথা ‘‌দুয়ার বক্সী’‌। 
মঙ্গলবার সকালে দশমী পুজোর শেষে দেবোত্তর ট্রাস্ট বোর্ডের সভাপতি তথা জেলা শাসক কৌশিক সাহা ও রাজপ্রতিনিধি ‘‌দুয়ারবক্সী’‌ অজয় কুমার দেব বক্সী মাকে প্রণাম করে বিদায় জানান। এবারে  চাকা লাগানো হাতে টানা গাড়িতে বিশালাকায় বড়দেবীকে আনা হয় যমুনা দীঘির ঘাটে। ঘাটেই হয় বিশেষ বিসর্জনের পুজো। দেওয়া হয় শুয়োর বলি। বংশ পরম্পরায় এই বলি দিয়ে আসছেন স্থানীয় বিমল দাসের পরিবার। এমনটাই জানান দেবোত্তর ট্রাস্ট বোর্ডর বড়বাবু জয়ন্ত চক্রবর্তী। এবারেও তার অন্যথা হয়নি। রাজপ্রথা মেনে এই সময় উপস্থিত থাকেন না রাজ পুরোহিত হীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বা অন্য কোনও পুরোহিত। শুয়োর বলি শেষে মায়ের লাল বস্ত্র খুলে নিয়ে চলে যান দেবোত্তর ট্রাস্ট বোর্ডের প্রতিনিধিরা। এভাবেই সম্পন্ন হয় বড়দেবীর বিসর্জন পর্ব।

জনপ্রিয়

Back To Top