নিরুপম সাহা, বাগদা, ১০ সেপ্টেম্বর- ক্যাম্পের ভেতরে বিএসএফের বেধড়ক মারে এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তাল হল বাগদা থানা এলাকা। যদিও বিএসএফের দাবি, ওই যুবক কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু বিএসএফের এই দাবি মানতে রাজি নয় মৃতের পরিবার। এই ঘটনায় দুই পক্ষই পুলিসের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে।  এ ব্যাপারে বনগঁার মহকুমা পুলিস আধিকারিক অনিল রায় জানিয়েছেন, দুই পক্ষের বক্তব্যই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আসগারের মৃত্যুর আসল কারণ জানতে তঁার মৃতদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট আসার পরেই পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পুলিস এবং মৃতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাগদা থানার মামাভাগিনা গ্রামের বাসিন্দা আসগার মণ্ডলকে (‌৩০)‌ শুক্রবার রাতে বাড়ি থেকে ধরে বিএসএফের মামাভাগিনা বর্ডার আউট পোস্টে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ক্যাম্পটিতে বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছে ৯৯ নম্বর ব্যাটেলিয়েন। বিএসএফ কর্তৃপক্ষের দাবি, ধৃত আসগারের কাছ থেকে বোমা তৈরির মশলা পাওয়া গেছে। সেই কারণে তঁাকে ক্যাম্পে ধরে আনা হয়। যদিও আসগারের পরিবারের দাবি, আসগার বছর তিনেক ধরে মুম্বইতে শ্রমিকের কাজ করছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়ায় চিকিৎসার জন্য দিন দশেক আগে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। তিনি কোনও ধরনের অসামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত নন।
বিএসএফের পক্ষ থেকে ওই ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার বাগদা থানায় লিখিত আকারে জানিয়েছেন যে, শুক্রবার রাত ৯টা নাগাদ আসগারকে বাড়ি থেকে ধরে বিএসএফ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। শনিবার সকালে সেখান থেকে যখন তঁাকে বাগদা থানায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, তখন হঠাৎই তিনি ঘাস মারার কীটনাশক খেয়ে ফেলেন। এই অবস্থায় তঁাকে প্রথমে বাগদা গ্রামীণ হাসপাতাল, সেখান থেকে বনগঁা মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তঁার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ায় সেদিনই তঁাকে কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। রবিবার রাত ১টা নাগাদ সেখানেই তঁার মৃত্যু হয়।
আসগারের এই মৃত্যুর জন্য বিএসএফ কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে তঁার স্ত্রী মর্জিনা মণ্ডল বাগদা থানায় লিখিত অভিযোগ করে জানিয়েছেন, ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে তঁার স্বামীকে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে। সেই কারণেই তঁার মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের আরও বক্তব্য, বিএসএফের দাবি অনুযায়ী যদি আসগার কীটনাশক খেয়ে থাকেন, তা হলে ক্যাম্পের মধ্যে তিনি সেটি পেলেন কী করে?‌ আসগারের স্ত্রী মর্জিনা মণ্ডল বলেন, ‘‌শুক্রবার রাতে হঠাৎই মামাভাগিনা ক্যাম্প থেকে বিএসএফের একটি গাড়ি করে কয়েকজন বিএসএফ কর্মী আমাদের বাড়িতে এসে আসগারের নাম ধরে খোঁজ করতে থাকে। আসগার তখন শুয়েছিলেন। বিএসএফের লোকজন এসেছে শুনে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন। বিএসএফের লোকেরা বলে, গঁাজার প্যাকেট কোথায় রেখেছিস?‌ আসগার তখন বলেন, আমি এইসব কারবার করি না। আর আপনাদের বিশ্বাস না হলে বাড়িতে খুঁজে দেখুন। এরপর বিএসএফের লোকেরা সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছু না পেয়ে তখনকার মতো চলে যায়।’‌
মর্জিনার দাবি, ‘‌মিনিট ২০ পর ফের ফিরে এসে হাতে একটি প্যাকেট দেখিয়ে বলে, এর মধ্যে বোমা তৈরির মশলা রয়েছে। এটা তোর বাড়ি থেকে পাওয়া গেছে। তুই এই কারবার করিস। এই বলে তারা আসগারকে মারতে মারতে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। আমরা সারা রাত ক্যাম্পের বাইরে অপেক্ষা করে বসে থাকলেও আমাদের সঙ্গে, এমনকি আমার ছোট্ট ছেলেটার সঙ্গেও আসগারকে দেখা করতে দেয়নি বিএসএফ। এরপর সকালে শুনি, আসগার নাকি ক্যাম্পের ভেতরে বিষ খেয়েছেন।’‌ আসগারের পরিবারের পাশাপাশি প্রতিবেশীদেরও অভিযোগ, বিএসএফের প্রচণ্ড মারে যখন আসগারের মরণাপন্ন অবস্থা, তখন নিজেদের দোষ ঢাকতে বিএসএফের লোকেরাই আসগারকে জোর করে কীটনাশক খাইয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে চালানোর চেষ্টা করছে।

মৃত আসগারের শোকার্ত পরিবার। ছবি:‌ প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top