তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: রোড‌ শোয়ে‌র নামে বিদ্যাসাগরের নামাঙ্কিত কলেজে ঢুকে তাঁর মূর্তি যাঁরা ভাঙলেন, সেই ‘‌বিদ্যার্থী’‌রা সম্ভবত এই মানুষটিকে চেনেননি। বিদ্যাসাগর নিজের একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রকে ত্যাজ্য করেছিলেন। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ঊনবিংশ শতাব্দীতে একজন ভারতীয় যতদূর যেতে পারেন ক্ষমতায় ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যে, তার চূড়া স্পর্শ করেও তিনি অকাতরে সব সরকারি পদ ত্যাগ করে নিজের লেখা বই ও প্রেসের সাহায্যে নিজের প্রতিষ্ঠিত ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয়ের খরচা, অসংখ্য বিধবার বিয়ে এবং বিয়ের পরও যাতে বিপন্ন না হয়, তার জন্য সাহায্য করে গেছেন। ওঁরা জানেন না, যে বিদ্যাসাগর কলেজে ঢুকে তাঁর মূর্তিকে যাঁরা ভেঙেছেন, সেই কলেজের প্রকৃত ইতিহাস। ১৮৫৯ সালে, যে বছর বিদ্যাসাগর সরকারি চাকরি ত্যাগ করেন, তার পরের বছর ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন পতিতপাবন সেন, গঙ্গাচরণ সেন ও আরও কয়েকজন। কিন্তু যা হয়, কিছুদিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠাতারাই দলাদলি করে স্কুলটিকে প্রায় শেষ করে ফেলেন। তখন পতিতবাবু, গঙ্গাবাবু ও বৈষ্ণবচরণ আঢ্যদের অনুরোধে বিদ্যাসাগর ওই স্কুলের সম্পাদক হন। ১৮৬১ সালে তাঁরই অনুরোধে যে পরিচালন কমিটি গঠিত হয়, তার সভাপতি হন কান্দির মহারাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ। অন্য সভ্যরা হলেন রমানাথ ঠাকুর, হীরালাল শীল, রামগোপাল ঘোষ ও হরচন্দ্র ঘোষ। সবাই রাজি হয়েছিলেন, কারণ বিদ্যাসাগর নিজে ছিলেন ওই স্কুলের সম্পাদক।
তিন বছরের মধ্যে এই স্কুলের নাম বদলে হল ‘‌হিন্দু মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন’‌। কারণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কোনও ট্রেনিং স্কুলকে অ্যাফিলিয়েশন দেবে না। সেই ১৮৬১ থেকে ১৮৭২ পর্যন্ত নিজে লেগে থেকে মহাবিদ্যালয়ের অনুমোদন আদায় করেন। ঠিক হয়, এই কলেজ ফার্স্ট আর্টস বা এফএ (‌পরবর্তীকালে ইন্টারমিডিয়েট আর্টস)‌ পড়াতে পারবে। ১৮৭৪–‌এ এফএ পরীক্ষায় ২১ জন ছাত্রের মধ্যে পাশ করে ৮ জন। তঁাদের মধ্যে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় হন যোগেন্দ্রনাথ বসু।
এই কলেজেরই ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। মাইনে পেতেন ২০০ টাকা। এই সময় তিনি সিটি কলেজেও পড়াতেন। ওখানে মাইনে ছিল ৩০০ টাকা। সুরেন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের নির্দেশ মতো সিটি কলেজ না ছাড়ায়, প্রিয় বন্ধুর পুত্র সুরেন্দ্রনাথকে পত্রপাঠ বিদায় করতে বিদ্যাসাগরের তিলমাত্র সময় লাগেনি। 
আমহার্স্ট স্ট্রিট ও সুকিয়া স্ট্রিটে তিনটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে চলত বিদ্যাসাগরের সংস্কৃত প্রেস যন্ত্র, প্রেস ডিপোজিটরি, কলেজ ও নিজের থাকা। এরই মধ্যে ১৮৭৫ সালে তৃতীয় কন্যা বিনোদিনীর সঙ্গে বিয়ে দিলেন হেয়ার স্কুলের শিক্ষক সূর্য্যকুমার অধিকারীর। উদ্দেশ্য, একদিন এই শিক্ষিত, উদার ছেলেটির হাতেই তাঁর নিজের হাতে তৈরি কলেজের সমস্ত দায়িত্ব তুলে দেবেন। প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও সূর্য্যকুমার রাজি হলেন মেট্রোপলিটনের সেক্রেটারি হতে। এই সময় শঙ্কর ঘোষ লেনে মহেন্দ্রনারায়ণ দাসের কাছ থেকে ধার করে ৩০ হাজার টাকার জমি কেনেন বিদ্যাসাগর। সেই জমির ওপর বাড়ি করার একটা পয়সাও তখন তাঁর হাতে নেই। ভাগ্যকুলের শ্রীনাথ রায়ের কাছে হাতচিঠি লিখে দিয়ে ধারের বা ওভারড্রাফ্‌টের ব্যবস্থা করেন। ১৮৮৫–‌তে আরম্ভ হয়ে ১৮৮৬–‌তে এই অসামান্য কলেজের ভবনটি তৈরি হয় সম্পূর্ণ ধারের টাকায়, যা শ্রীনাথ রায় দিয়েছিলেন মানুষ–‌সিংহ বিদ্যাসাগরকে। মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনই দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত বেসরকারি প্রথম শ্রেণীর কলেজ। 
যে কোনও অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতির সঙ্গে যিনি সারাজীবন লড়াই করেছেন, তাঁর লড়াই এবার শুরু হল নিজের মনোনীত পাত্র অর্থাৎ কলেজের অধ্যক্ষ ও সেক্রেটারি সূর্য্যকুমারের বিরুদ্ধে। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে কলেজের ক্যালেন্ডারে তাঁর নাম থাকলেও, পরের বছরের ক্যালেন্ডারে ওই নাম আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেন?‌ বিদ্যাসাগর কোনও কারণ জানাননি। যেমন জানাননি ‘‌কুপথগামী’‌ পুত্র নারায়ণচন্দ্র কী করেছিলেন?‌ 
১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে ৭১ বছর বয়সে বিদ্যাসাগর প্রয়াত হন। কিন্তু তঁার হাতে তৈরি মহাবিদ্যালয়ের যাত্রা আজও অব্যাহত। ২০২০–তে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ‌ তাঁর জন্মের দুশো বছর পালন করবে, সারা দেশের সঙ্গে। যিনিই প্রধানমন্ত্রী হন, তাঁকে ‌আসতেই হবে এই বাংলায় তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতেই। তাঁর মূর্তি ভেঙে যাঁরা বাহবা নিতে চাইলেন, তাঁরাই আজ মুখ লুকোবার জায়গা পাচ্ছেন না। এঁরাও বিদ্যার্থী!‌ ছিঃ!‌  ‌‌‌

ছবি:এএনআই

জনপ্রিয়

Back To Top