রিনা ভট্টাচার্য- তথ্যপ্রযুক্তি থেকে গ্রামোন্নয়ন। বাংলার গ্রামেগঞ্জে অনাদরে পড়ে থাকা লোকসংস্কৃতিকে দেশবিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই ব্রত নিয়ে গত সাত বছর ধরে নিরলস কাজ করে চলেছেন সৌরভ মুখোপাধ্যায়। তথ্যপ্রযুক্তিতে ডিগ্রি লাভ করে চাকরি পেয়েছিলেন আমেরিকার সফ্‌টওয়ার সংস্থায়। সেই পেশা ছেড়ে বানিয়েছেন কলকাতা সোসাইটি ফর কালচারাল হেরিটেজ নামে একটি সংগঠন। অমন লোভনীয় চাকরি ছাড়লেন কেন?‌ সৌরভ বলছেন, সফ্‌টওয়ার সংস্থায় বড় একঘেয়ে কাজ। তার মধ্যে সৃজনশীলতা নেই। আমি চেয়েছিলাম কাজের মধ্যে আনন্দ পেতে। স্বপ্ন ছিল, একা নয়, অনেককে সঙ্গে নিয়ে কাজ করব। তাতে সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ, বিশেষত মহিলাদের জীবনযাত্রায় আর্থিক সচ্ছলতা আসবে। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা সোজা কাজ নয়। তার জন্য চাই যথাযথ জীবিকার সংস্থান। দরিদ্র আদিবাসী মানুষ যদি আর্থিক সচ্ছলতার মুখ দেখে, তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতাও তার অধরা থাকবে না। কীভাবে জীবিকার সংস্থান করা যাবে?‌গ্রামে জীবিকা অর্জনের যে চিরাচরিত পথগুলি আছে, সেগুলিরই বিকাশ ঘটাতে হবে সকলের আগে। সেজন্য সৌরভের সংগঠনের কর্মীরা বিভিন্ন গ্রামে, বিশেষত আদিবাসী এলাকায় কৃষি, ফলের বাগান করা, মাছ চাষ ও মুরগি পালনের পদ্ধতিগুলি উন্নততর করে তোলার চেষ্টা করে চলেছেন। সেই সঙ্গে তাঁরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার প্রসারেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিয়ে গ্রামবাসীদের সহায়তা করেন। গ্রামীণ সংস্কৃতি যথা লোকগান, লোকনৃত্য এবং নানা কারিগরিও বহু লোকের জীবিকার মাধ্যম হতে পারে। সৌরভের সংগঠন গ্রামের সেই সম্পদের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও তার বিপণনে সাহায্য করে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে নতুন নতুন পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলাও তাদের লক্ষ্য। কলকাতা সোসাইটি ফর কালচারাল হেরিটেজ কাজ শুরু করেছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলা ব্লক থেকে। সেখানকার পটচিত্র বিখ্যাত। ২৩ জন দরিদ্র পটচিত্রশিল্পীকে নিয়ে সংগঠনের কাজ শুরু হয়। ১৬ মাসের মধ্যে শিল্পীর সংখ্যা বেড়ে হয় ১৯০। এখন এই সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওডিশার ২১১৫ জন গরিব শিল্পীকে নিয়ে কাজ করছে। হিডকোর সঙ্গে যৌথভাবে সৌরভের সংগঠন চেষ্টা করছে যাতে শিল্পীরা নিজেদের কাজ বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য একটা মঞ্চ পান।  প্রতি বছর ওই সংগঠন বাংলা নববর্ষ পালন করে। সেই উপলক্ষে ইকো পার্কের কাফে একান্তে দিনভর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর পাশাপাশি গত তিন বছর ধরে একটি আর্ট কার্নিভালেরও আয়োজন করা হচ্ছে। তার নাম চিত্রপট। গত বছর বাংলাদেশ, ইরান, আলবানিয়া, সার্বিয়া, গ্রিস, নিউ ইয়র্ক, রোমানিয়া এবং স্লোভেনিয়ার চিত্রশিল্পীরা সেই উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সেই কার্নিভাল হওয়ার কথা আছে।  পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুর ব্লকে সৌরভের সংগঠন ৩৫৬ জন প্রান্তিক মহিলাকে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। মানুষ ও পশুর সঙ্ঘাত কমানোর জন্য সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ অঞ্চলে ওই সংগঠন বন দপ্তরের সঙ্গে কাজ করে চলেছে। এতে স্থানীয় মানুষের অরণ্যের ওপরে নির্ভরতা কমেছে। সংগঠন সেখানে ৩২টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করছে। সংগঠন মনে করে, কঠিন বর্জ্য পদার্থের পুনর্নবীকরণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষ বিকল্প জীবিকার সন্ধান পেতে পারেন। সেজন্য গত বছর ‘‌আবর্তনী’‌ নামে এক প্রকল্প চালু হয়েছে। কঠিন বর্জ্যের পুনর্নবীকরণ যে পণ্যগুলি তৈরি হয়েছে, গত বছর এনকেডিএ এবং হিডকোর সহায়তায় সেগুলি ইকো পার্কে প্রদর্শিত হয়েছিল। সেই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছিলেন হিডকোর চেয়ারম্যান দেবাশিস সেন। রাজ্য সরকারের নগরোন্নয়ন দপ্তরের স্টেট আরবান ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির বিপণনের দিকটাও দেখে সৌরভের সংগঠন। ওই সংস্থার অধীনে যত স্বনির্ভর গোষ্ঠী আছে, তাদের পণ্য যাতে বাজার পায়, তার চেষ্টা করে কলকাতা সোসাইটি ফর কালচারাল হেরিটেজ। ‌‌

গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনায় সৌরভ মুখোপাধ্যায়।

জনপ্রিয়

Back To Top