জিওফ্রে বয়কট: মিডল গেমের সাফল্য ধরে রাখাটা খুব জরুরি। সেটা টেস্ট ম্যাচও হতে পারে। লিমিটেড ওভার ক্রিকেটের ক্ষেত্রে এই সময় খেলাটা ধরে ফেলা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এমনকী শুরুর দিকে ব্যর্থতাও, খানিকটা হলেও পুষিয়ে দেওয়া যায় এই মিডল গেমে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাট বা বোলিং করতে পারলে। সেমিফাইনালে যে ৪টি দল ছিল, এই মিডল গেম ব্যাপারটায় তাদের মধ্যে ক্ষমতা অনুযায়ী দুটি দলই শীর্ষে ছিল। ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ড। মূলত এই কারণেই ইওয়িন মর্গান এবং কেন উইলিয়ামসনরা ফাইনালে পৌঁছতে পেরেছিল।
শুরুর দিকে বিরাট ও রোহিত ফিরে যাওয়ার পর ভারতের মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানরা সেভাবে ম্যাচটা ধরতে পারেনি। এমনিতেই এবার বিশ্বকাপে বিরাট বাহিনীর মিডল অর্ডারে ছিল অজস্র ফুটো। সেগুলো মেরামত করার জন্য গ্রুপ লিগে ৮টি ম্যাচ পেলেও (‌১টি ম্যাচ তো বৃষ্টির কারণে ভেস্তে গিয়েছিল)‌, তা কাজে লাগাতে পারেনি। 
ফাইনালে ওই মিডল গেমটা নিউজিল্যান্ড এবং ইংল্যান্ড চমৎকার খেলেছে। এ কারণে ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো ম্যাচটা এ‌প্রান্ত থেকে ও‌প্রান্তে দোল খেয়েছে। এমনকী শেষ বল পর্যন্ত ছিল টানটান উত্তেজনা। ১৯৬১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ম্যাচটা ‘‌টাই’‌ হয়েছিল। প্রথম ‘‌টাই’‌–‌এ ক্রিকেট বিশ্ব আলোড়িত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ ঘিরে যে টেনশন, নাটক, উত্তেজনা আমরা পেয়েছি, তা সত্যিই আগে হয়নি। দেখার সুযোগও ছিল না। ভেরি এক্সাইটিং। ভেরি ভেরি এক্সাইটিং।
বৃহস্পতিবার এই লেখা যখন লিখছি, তখন শুনতে পেলাম, বিরাট কোহলিরা নাকি পুরো শক্তি নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাবে। এটা ভাল ব্যাপার। আগে কেন অনেক তারকা এই সফরের প্রথমার্ধ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল, তা জানি না। এখন যাচ্ছে সবাই। ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলিতে নিশ্চয়ই থাকবে খুশির ঢেউ। তবে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর থেকে কিন্তু বিশ্বকাপ জিতে ফেরা যাবে না। দ্যাট ইজ ডান অ্যান্ড ডাস্টেড। ওখানে নাম লেখা হয়ে গেছে ইংল্যান্ডের (‌নিউজিল্যান্ডের জন্য খুব খারাপ লাগছে)‌।
আবার বিশ্বকাপে ফিরি। বৃষ্টির কারণে এই লম্বা বিশ্বকাপে কয়েকটি দিন নষ্ট হয়েছে। আমরা মেজাজ নষ্ট করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ছিল একেবারে টানটান উত্তেজনায় ভরা। খুব আনন্দ পেয়েছি এবার বিশ্বকাপ দেখে। ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড দুটো দলই কিন্তু ফাইনালে দারুণ খেলেছে। শুরু থেকেই বলে আসছিলাম, নিউজিল্যান্ড হল একটা বিপজ্জনক দল। দলে তারকা নেই, অথচ সবাই তারকা। ফাইনালে সমান সমান রান করেও, বেশি সংখ্যক বাউন্ডারি না মারার কারণে নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপটা পেল না। এটা নিয়ে এই সুন্দর দেশ থেকে অল্পস্বল্প হতাশা, বিক্ষোভের ঢেউ পাওয়া গেলেও, তেমন কোনও হাহাকার কিন্তু করেনি ওরা। এটা শিক্ষণীয়। যদি এমন ঘটনা ভারত বা ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে ঘটত, তাহলে দয়া করে কল্পনা করে নিন, কতটা পরিমাণ উত্তেজনার বারুদ তৈরি হত। বিক্ষোভে বিক্ষোভে জেরবার হয়ে যেত ক্রিকেট দুনিয়া। নিউজিল্যান্ডের কাছ থেকে শিখতে হবে, কীভাবে হেরে গেলেও সহজভাবে তা মেনে নিতে হয়। ওরা যেন বলে দিল, পরের বিশ্বকাপে প্রস্তুত হয়ে আসবে। আগাম শুভেচ্ছা।
এক–‌একটা বিশ্বকাপ শেষ হয়, আর আমাদের মাথায় দিয়ে যায় নতুন নতুন তত্ত্ব। এবার দেখলাম, শুরুর দিকে উইকেট বঁাচিয়ে আত্মরক্ষা করে শেষদিকে বড় রান তোলার ঝেঁাক। 
ইংল্যান্ডের জেসন রয় অবশ্য এটা মানেনি। এই ছেলেটি দলে ছিল না ৩টি ম্যাচে। ৩টিতেই হেরেছে ইংল্যান্ড। এমনকী ফাইনালেও জেসন কিন্তু গুটিয়ে থাকেনি। ও জানত, দলের অন্য ব্যাটসম্যানরা সামলে নেবে। রোহিত শর্মার মতো ক্লাসিক্যাল ঘরানার ব্যাটসম্যান কী চমৎকারভাবেই না নিজের ব্যাটিং স্টাইল পাল্টে অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছিল ইনিংস তৈরির কায়দা। অদ্ভুত একটা লাবণ্য আছে রোহিতের ব্যাটে। একটা বিশ্বকাপে ৫টা সেঞ্চুরি, ভাবা যায় না। খারাপ লাগছে এ কথা ভেবে যে, সেমিফাইনালে ও কিছু করতে পারেনি। এবার ইন্ডিয়া টিমটা অনেক কারণেই ঠিক যেন হাত খুলে, মন খুলে ক্রিকেট খেলতে পারেনি। সেমিফাইনালে ওঠাটা কৃতিত্বের, তবু এই সমালোচনাটা বিরাটদের প্রাপ্য। 
অস্ট্রেলিয়া সেমিফাইনাল থেকে ছিটকে গেল, সেভাবে নিজেদের মেলে ধরতে না পারার কারণে। ওয়ার্নার, স্মিথ ছাড়া অন্য ক্রিকেটাররা টেনে নিয়ে যাবে ভেবেছিলাম, কিন্তু পারেনি। সেখানে নিউজিল্যান্ড প্রথম বল থেকে হার না–‌মানা মানসিকতা দেখিয়ে গিয়েছে। সুপার ওভারে ১৫ রান তুলেছিল ইংল্যান্ড। বিশ্বাস করুন, ভাবিনি নিউজিল্যান্ডও ১৫ রান তুলে ফেলবে। এটাই হচ্ছে দঁাত কামড়ে, মাটি কামড়ে লড়ে যাওয়ার ফসল। আশা করব, ৪ বছর পর সেমিফাইনালের ৪টি দল–‌সহ অন্য দলগুলো আরও তৈরি হয়ে আসবে। তবে, সব দলের প্রতি একটা অনুরোধ, মিডল গেম–‌এ যাতে ভাল খেলা যায়, সে ব্যাপারে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে। যাবতীয় চড়াই–‌উতরাইয়ের রহস্য তো থাকে ম্যাচের মধ্যবর্তী সময়েই।‌

স্ত্রী অনুষ্কাকে নিয়ে দেশে ফিরলেন বিরাট কোহলি। মুম্বইয়ে। ছবি:‌ টুইটার‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top