আজকালের প্রতিবেদন: ২০১৩ সালের মার্চ মাস। জলপাইগুড়ির বাড়ি থেকে ঠিকানা বদলে তিনি চলে আসেন কলকাতা সাই সেন্টারে। চার ভাই–বোন সহ ছয়জনের সংসারে, অভাব তখন নিত্য সঙ্গী। মেয়ে দারুণ দৌড়য় বলে তাকে কলকাতায় পাঠানোর সম্মতি দিয়েছিলেন বাবা পঞ্চানন বমর্ন। কারণ, মেয়ে যদি একটু ভাল খেলাধুলো করে একটা চাকরি জোগাড় করতে পারে, এবং তাতে যদি কিছুটা সংসারের হাল ফেরে। সাফল্যের মঞ্চে বসেই অতীতের সেই দিনগুলোর কথা গড়গড় করে বলে যাচ্ছি‍লেন বছর একুশের মেয়েটি।
স্বপ্না বর্মন। পাঁচ বছরের মাথায় সেই মেয়েই এশিয়ান গেমসের হেপ্টাথলনে দেশকে সোনা এনে দিয়ে গর্বিত করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই শুক্রবার দুপুরে স্বপ্নাকে স্বাগত জানাতে ভিড় উপচে পড়েছিল কলকাতা বিমানবন্দরে। হাজির রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অজিত ব্যানার্জি, সচিব স্বপন (বাবুন) ব্যানার্জি। কলকাতা সাই সেন্টারের কয়েকশো বাচ্চাও জাতীয় পতাকা, স্বপ্নার সোনালী মুহূর্তের নানা ছবির কোলাজ, প্ল্যাকার্ড নিয়ে টানা জয়ধ্বনি দিয়ে যাচ্ছিলেন।
চোট তো ছিলই। তার ওপর এদিন গায়ে ধুম জ্বর। সকাল থেকে নাগাড়ে বমি করে যাচ্ছেন। তবুও বিকেলে সাইয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হাজির। যে মঞ্চ থেকে তাঁর উত্থানের শুরু, সেখানে সতীর্থদের মাঝে সংবর্ধিত হওয়ায় লোভ সামলাতে পারেননি এই অ্যাথলিট। বিকেলে স্বপ্না যখন অনুষ্ঠান মঞ্চে এলেন, পিছনের জায়ান্ট স্ক্রিনে তখন এশিয়াডে তাঁর সোনা জয়ের নানান মুহূর্তের ভিডিও চলছে। যা দেখে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন স্বপ্না। আর পোডিয়ামে মেডেল গলায় ঝোলানের মুহূর্তে তো পুরো হলঘরই করতালিতে ফেটে পড়ল। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন গ্রহন করলেন স্বপ্না। বলেন, ‘এশিয়াডে প্রথম ইভেন্টের পর দাঁতে ব্যথার জন্য প্রচন্ড কেঁদেছিলাম। কোনওরকম খাওয়া–দাওয়াও করতে পারিনি। কিন্তু হাল ছাড়িনি। চোট না থাকলে ৬১০০ পয়েন্ট পূরণ করে ফেলতাম। তবে সোনা জয়ের পিছনে জ্যাভলিন থ্রো–টাই আমার টার্নিং পয়েন্ট।’
তাঁর উচ্চতা দেখে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। ২০১১ সালে ঠিক যে ভুলটা করেছিলেন তাঁর বর্তমান কোচ সুভাষ সরকার।

পরিচিতদের মুখে জলপাইগুড়ির মেয়েটির প্রতিভার কথা শুনলেও অবাক হয়েছিলেন স্কুল গেমসে স্বপ্নার হাই জাম্প দেখে। তারপর থেকেই তিনিই স্বপ্নার কোচ। এদিন সেই সুভাষ নিজেই স্বীকার করে নেন, ‘সত্যি বলতে প্রথমবার স্বপ্নাকে দেখে খুব বেশি ইমপ্রেসড হইনি। সংশয়টা হত ওর উচ্চতার জন্যই। তবে সময় যত এগিয়েছে, ও চমকে দিয়েছে। তাই সমালোচকরা যখন এশিয়াডের আগে স্বপ্নাকে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল, আমি জানতাম ও ভাল কিছু করবেই।’ যা শুনে পাশ থেকে স্বপ্না আবার বলে দিলেন, ‘আমার সাফল্যের যাবতীয় কৃতিত্ব স্যরের। তাই তো এবারের টিচার্স ডে–তে স্যরকে সেরা গিফটটা দিলাম। এশিয়াডের সোনার মেডেল।’ একট স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এখন টার্গেট অলিম্পিক। সেটাও ধাপে ধাপে। স্বপ্নার কথায়, ‘আপাতত চোট সারিয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে চাই। তারপর লক্ষ্য ৬৩০০ পয়েন্ট। আর অলিম্পিকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন তো সব অ্যাথলিটেরই থাকে।’ এশিয়াডের এই সাফল্যের পর নিজের জীবনে কোন জিনিসের পরিবর্তন আনতে চান প্রশ্নে হাসতে হাসতে স্বপ্নার জবাব, ‘রাগটা একটু কমাতে চাই।’ 
পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বদলালেও জীবন বদলে গিয়েছে এমনটা মানতে নারাজ স্বপ্না। বলেন, ‘আমি কিন্তু আগের মতোই আছি। আমাকে আগের মতোই দেখবেন।’ মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দাদাকে চাকরির প্রস্তাব দিয়েছেন। শুনে অভিভূত স্বপ্না। তিনি কী চান, প্রশ্নের জবাবে স্বপ্না বলেন, ‘কলকাতায় সাইতে থাকি। এখানে থাকার কোনও জায়গা নেই। সরকার যদি সল্টলেক বা নিউটাউন এলাকায় কোনও ফ্ল্যাট বা জায়গা দেয়, তাহলে উপকৃত হব।’
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস। পাঁচ বছরে লক্ষ্যটা অনেক বদলে গিয়েছে স্বপ্নার। আগে যে মেয়ে একটা চাকরির লক্ষ্য নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন এখন তিনি চাকরি নিয়ে ভাবছেন না। তাঁর মাথায় এখন অলিম্পিক ঘুরপাক খাচ্ছে। বলছেন, ‘অনেক জায়গা থেকেই চাকরির প্রস্তাব পাচ্ছি। তবে এখন ওসব নিয়ে ভাবছি না। বরং এখন যত দ্রুত সম্ভব চোট সারিয়ে ফেলে ট্র্যাকে নামতে হবে।’‌‌

সাইতে স্বপ্নাকে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন সোমা বিশ্বাসের। আশীর্বাদের হাত কোচ সুভাষ সরকারের। ছবি:‌ রনি রায়

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top