সুনীল গাভাসকার: স্বপ্ন শেষ। বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল থেকে ছিটকে গেছে আমাদের ভারত। জানি কেউ কেউ বলবেন, শেষ চারে যাওয়াও তো এক অর্থে সাফল্য। তবে কথাটা খাটে সেই সব দলের ক্ষেত্রে যাদের আমরা সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ধরিনি বা ভাবিনি। রজার ফেডেরার, টাইগার উডস চ্যাম্পিয়ন হবেই, এটা যেমন আমরা ধরে নিই, ক্রিকেটে ভারতের ক্ষেত্রেও কিন্তু তাই। ভারত সেমিফাইনালিস্ট হবে, এটুকুতে আমরা একেবারেই সন্তুষ্ট নই। টেনিসে নিক কিরগিয়স বা বাউতিস্তা অগাট যদি সেমিফাইনালে ওঠে, তা হলে ধরে নেওয়া হয় ওরা খুবই ভাল করেছে। কিন্তু ফেডেরার বা টাইগার উডস যদি কোনও টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন না হয়, তা হলে সেটাকে ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা হয়। 
জানি, এখন অনেক গল্প ছড়াবে। চক্রান্তের গল্প শোনা যাবে। বিরাটদের ব্যর্থতার জন্য অনেককেই কাঠগড়ার দাঁড় করানো হবে। তবে এই মুহূর্তে অন্য কিছুর থেকে যেটা বেশি জরুরি, সেটা হল দলের পাশে থাকা। বিরাটরা মাঠে নেমে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেমিফাইনালে সেটা যথেষ্ট ছিল না। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে রাউন্ড রবিন পর্বের ম্যাচেও দিনটা বিরাটদের ছিল না। ওরা হেরে গিয়েছিল। 
এখন প্রশ্ন হল, সেমিফাইনালে কিউয়িদের বিরুদ্ধে হারটা কেন আমরা হজম করতে পারছি না?‌ কারণ ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার থেকে নিউজিল্যান্ডকে আমরা সহজ প্রতিপক্ষ ভেবেছিলাম। শুধু ভারতীয় সমর্থকরা নন, আইসিসি–র টিভি কর্তৃপক্ষও ধরে নিয়েছিল নিউজিল্যান্ড ছিটকে যাবে। তাই নিউজিল্যান্ডের দুই ধারাভাষ্যকার সাইমন ডুল এবং ইয়ান স্মিথকে গত বৃহস্পতিবারই দেশে ফিরে যাওয়ার টিকিট ধরিয়ে দিয়েছিল!‌ 
বলতে আপত্তি নেই, ভারত এখন দু’‌জন ব্যাটসম্যানের দল। দু’‌জনের ওপরই নির্ভরশীল। রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি যদি শুরুতে আউট হয়ে যায়, তা হলে দলের বাকিরা দায়িত্ব নিয়ে ব্যাট করে শূন্যতা ভরাবে, জয় এনে দেবে— এটা ভাবাই ভুল। গত দু’‌বছর ধরে দলের চার নম্বর জায়গাটা নিয়ে অনেক তালগোল পাকিয়েছে। অম্বাতি রায়ডুকে গত এক বছর ধরে চারে ভেবেছিল আমাদের অধিনায়ক। অথচ তাকেই দু–‌‌দু’‌বার উপেক্ষা করা হল বিশ্বকাপ চলাকালীন!‌ ঋষভ পন্থ চারে নেমে খুব খারাপ খেলেছে বলব না। তবে চারে যে নামবে সে ৩০, ৪০ নয়, বড় রান করবে— এটাই ধরে নেওয়া হয়। ঋষভকে ঠিকঠাক পরিচালন করলে এবং সময়ের সঙ্গে ও নিজে পরিণত হলে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। তবে আমার মনে হয়, শুধু চার নম্বর জায়গাটা নিয়ে নয়। পাঁচ ও ছয় নম্বরে কে কে নামবে সেটাও ভাবা উচিত। আর সেটা এখন থেকেই। পাঁচ, ছয়ে কে কে নামবে, এটা যদি আগে থেকে ভাবা যেত তা হলে সেমিফাইনালে ধোনিকে পরে পাঠানো নিয়ে সমালোচনা হত না। শুধু নির্বাচকরা নন, টিম ম্যানেজমেন্টেরও মেনে নেওয়া উচিত ওরা সমস্যা সমাধান করতে পারেনি। আসলে বিশ্বকাপের আগে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি এবং শিখর ধাওয়ানের দুরন্ত ফর্ম দেখে আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম চার, পাঁচ বা ছয়ে কাকে খেলাব। ওই জায়গাগুলোয় কোনও অস্বস্তি আছে কিনা। 
অন্যদিকে ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের নামে আমাদের দুই জোরে বোলার ভুবনেশ্বর কুমার আর মহম্মদ সামি ম্যাচ প্র‌্যাকটিস কম পেয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিজেদের মান বাড়াতে পারেনি। সঠিক ছন্দ পায়নি। এমনকি আত্মবিশ্বাসেও ঘাটতি ছিল। একটা কথা এই জায়গায় বলা দরকার। এরা এখন চূড়ান্ত ফিট অ্যাথলিট। এদের এভাবে বিশ্রাম দেওয়া বা লুকিয়ে রাখার কোনও মানে নেই। রাখলে উল্টো ফল হতে বাধ্য। 
এটা ঠিক, দেশের হয়ে খেলার সময় কোনও প্লেয়ারই বিশ্রাম নিতে চায় না। বরং সব ম্যাচেই খেলতে চায়। যদি ব্যতিক্রম হিসেবে কোনও প্লেয়ার বিশ্রামের অপেক্ষায় থাকে, তা হলে সেই ক্রিকেটারকে চিরদিনের জন্য ছুটিতে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। তবে অনেক সময়ই দেখা যাচ্ছে জরুরি কারণ না হলেও প্লেয়ারদের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য বিশ্রাম দেওয়া হচ্ছে। আমি বলব, এই ব্যাপারটা নিয়েও ভাবনা–চিন্তা করার সময় এসেছে। ভারতের হয়ে খেলে বলেই প্লেয়ারদের তো এত নাম–ডাক। ওদের জীবনে এত সুখ–স্বাচ্ছন্দ্য। তাই যখন ভারতীয় দলের দরকার, তখন যদি প্লেয়াররা দলের পাশে না থাকে, ছুটি নেয়, তা হলে তাদের ছেঁটে ফেলাই ভাল। সে ছোট, বড় যে প্লেয়ারই হোক। কথায় আছে, আদর দিলে বাঁদর তৈরি হয়। ভারতীয় ক্রিকেটে সেটা না হলেই ভাল। ‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top