ভারতীয় ক্রিকেটে হইহই তাঁকে নিয়ে। তবু বিশ্বকাপের প্রাথমিক  স্কোয়াডে তিনি নেই। কিন্তু ঋষভ রাজেন্দ্র পন্থ অন্য এক ধাতুতে গড়া। লিখেছেন সুতপা ভৌমিক।

বেবি ফেস। বেবিসিটার। কিন্তু বেচারা নন।
ঋষভ রাজেন্দ্র পন্থ।
‌‘‌চমকেই গেছি। যদি পন্থের ফর্মের কথা মাথায় রাখি। শুধু আইপিএল নয়, তার আগে থেকেই ও দারুণ ব্যাট করছে। উইকেটকিপিংয়েও উন্নতি স্পষ্ট। প্রথম ছয়ে ও থাকলে বাঁ–হাতি একজনের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে বিপক্ষের বোলারদের চাপে ফেলত।’‌ বক্তা সুনীল গাভাসকার। ‘‌বেচারা’‌র বেশভূষা পরবেন না বলে যিনি ব্যাট–প্যাড তুলে রেখেছিলেন এমন সময়ে, যখন ‘‌এখনও কেন সরছে না’‌ প্রশ্নের বদলে ‘‌এখনই কেন সরে গেল?‌’‌ এই প্রশ্নের ধ্বনি–প্রতিধ্বনিই বেশি ছিল। 
আহা–উহু, দেখেছো ছেলেটাকে ইচ্ছে করে ছুড়ে ফেলে দিল, লবি, ষড়যন্ত্র গন্ধ ইত্যাদির আশ্রয় না খুঁজে গাভাসকার যুক্তির তাস সাজিয়েছেন। ঋষভকে বেচারা ভাবতে তাঁর বয়ে গেছে।
বেবি ফেস। বেবিসিটার। কিন্তু বেচারা নন ঋষভ পন্থ।
কী দায় পড়েছে যে ঋষভকে বেচারা ভাবতে যাবেন‌ রিকি পন্টিং? বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া কী করবে, তা নিয়েই আপাতত তাঁর যত ভাবনা। স্মিথ–ওয়ার্নার জাতীয় ফিরলেও ‘‌চোর–চোর’‌ রব গ্যালারিতে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়বে কিনা, পন্টিংয়ের তাই জানা নেই। তিনি কেন ভারতের বিশ্বকাপ দলে যাঁর ঠাঁই নেই, তাঁকে নিয়ে ভাবতে যাবেন! 
কিন্তু কী আশ্চর্য, তিনিও বলছেন— ‘‌ভারতের বিশ্বকাপ দলে ঋষভ পন্থকে না দেখে আমি বিস্মিত। চার বা পাঁচে ওর মতো একজন ব্যাটসম্যান থাকা মানে সেটাই এক্স ফ্যাক্টর। ভারতের সঙ্গে অন্য দলগুলোর তফাৎ গড়ে দিতে পারত ওর উপস্থিতি।’‌ অবশ্য হতে পারে পন্টিং দিল্লি ক্যাপিটাল্‌সের কোচ। আইপিএলে যে দলের হয়ে খেলছেন ঋষভ। তাই তিনি বিস্মিত।   
শেষ হয়ে হইল না শেষ। কোনও কোনও বিশেষজ্ঞের বিশেষ বিশেষ‌ মন্তব্য দাগিয়ে রাখতে হয়। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়কের ক্ষেত্রে যেমন। 
অস্ট্রেলিয়া সফরের চতুর্থ টেস্টের দ্বিতীয় দিন। ঋষভ অপরাজিত ১৫৯। ভারতের প্রথম ইনিংসের স্কোর ৬২২/‌৭ (‌‌‌ডিক্লেয়ার্ড)‌‌। পন্টিংয়ের আড়াই লাইনের বিশ্লেষণ ছিল, ‘‌পন্থ প্রতিভাবান। খেলাটা দারুণ বোঝে। আমরা সবাই ধোনির কথা বলি। জেনে রাখুন, এই বাচ্চা ছেলেটা ধোনির থেকেও বেশি টেস্ট সেঞ্চুরি করবে।’‌ 
বেবি ফেস। বেবিসিটার। কিন্তু বেচারা নন ঋষভ পন্থ।
তখনই পন্টিংয়ের কথা শুনে মাথা ঘুরে গেছিল?‌ ডানা গজিয়েছিল?‌ তার অবকাশ অবশ্য আগেই ছিল। ২০১৬ সালের অনূর্ধ–১৯ বিশ্বকাপে ১৮ বলে ৫০ রান। অনূর্ধ–১৯ পর্যায়ে দ্রুততম। ২০১৬–’১৭ রনজি মরশুম। মহারাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ৩০৮ রান। প্রথমশ্রেণীর ক্রিকেটে সবচেয়ে কমবয়সী ক্রিকেটার হিসেবে ত্রিশতরান করার তালিকায় তৃতীয়। সেই মরশুমেই ঝাড়খন্ডের বিরুদ্ধে ৪৮ বলে সেঞ্চুরি। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে দ্রুততম শতরান।
স্কুপ, প্যাডেল, ফ্লিক— সব তাঁর ঝুলিতে সব শট মজুত। যখন–তখন বেরিয়ে আসে হাত থেকে। অবলীলায়। তাঁকে ব্যাট করতে দেখলে হিংস্র এবং ভয়ঙ্কর— দুটো শব্দই মনে পড়ে। 
বেবি ফেস‌। বেবিসিটার‌। কিন্তু বেচারা নন ঋষভ পন্থ। 
বরং চরম পেশাদার। হতে পারে বয়স এখন মাত্রই একুশ। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রাথমিক দল থেকে বাদ পড়ে (পরে প্রবল বিতর্ক ওঠায় ‘স্ট্যান্ডবাই’ হিসেবে সুযোগ পেয়ে) পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসার ছেলে নন। 
শিক্ষাটা পাওয়া সম্ভবত উত্তরাধিকার সূত্রেই। উত্তরাখন্ডের রুরকি থেকে দিল্লি আসার পর মাথার ওপর ছাদ ছিল না। কোথায় থাকবেন, ‌সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতোও কেউ ছিলেন না। তবু ছেলের স্বপ্ন হেলায় উড়িয়ে দিতে পারেনি পন্থ পরিবার। ক্রিকেট ছেড়েছুড়ে পড়াশোনায় মন দিতে বলেননি তাঁরা। অতএব রাজেন্দ্র এবং সরোজ পন্থের পুত্র আশ্রয় নিলেন মোতিবাগের গুরুদ্বারে। গুরুদ্বারে ‘‌স্বেচ্ছাশ্রম’‌ অনেকেই করেন। সরোজ দিয়েছিলেন ইচ্ছে এবং শ্রম‌। গুরুদ্বারে কাজ করে ‘‌আশ্রিতা’‌ শব্দটা ধুয়েমুছে ফেললেন। আর তাঁর পুত্র অনূর্ধ–১২ টুর্নামেন্টে খেলে তিনটে সেঞ্চুরি করলেন!‌ সঙ্গে টুর্নামেন্টে সেরার সম্মান। 
পরিবারের আদরের সন্তান তো বটেই। কিন্তু ‌বাবা–বাছা সংস্কৃতিতে কোনওদিন ঋষভকে লালন করা হয়নি। 
২০১৭ সালে আইপিএলে ঋষভের দ্বিতীয় মরশুম। ২৪ ঘণ্টা পর রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের বিরুদ্ধে ম্যাচ। ৫ এপ্রিল ঘুমের মধ্যে চিরঘুমে চলে গেলেন বাবা রাজেন্দ্র। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে গেল চারদিক। দিনকয়েক আগে মায়ের অস্ত্রোপচার হয়েছিল। তখনও তিনি হাসপাতালে ভর্তি। আচমকা বাবার কী হল, সেই প্রশ্নটা নিয়ে নাড়াচাড়ার করার অবসরটুকুও পাননি। ছুটেছেন রুরকিতে। প্রয়াত পিতার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেই দলের সঙ্গে যোগ দিতে আবার বেঙ্গালুরুতে। কানাঘুষো চলছিল, ঋষভ অনিশ্চিত। বাবার দাহকাজ করতে গিয়ে হাত পুড়ে গেছে। শরীর এবং মনের ক্ষত সামলে খেলতে পারবেন?‌ ঋষভ নামলেন। ৩৩ বলে হাফসেঞ্চুরি। ঋষভ খেললেও তৎকালীন দিল্লি ডেয়ারডেভিল্‌স শেষপর্যন্ত ম্যাচটা জিততে পারেনি। কিন্তু ঋষভ কতটা ডাকাবুকো, সেটা বোঝা গিয়েছিল।  
অস্ট্রেলিয়া সফরে হেয় করেছিলেন অধিনায়ক টিম পেইন। ‘‌ভাই, তুমি বরং অস্ট্রেলিয়ায় আর ক’‌দিন ছুটি কাটিয়ে যাও। আচ্ছা, তুমি কি বাচ্চা সামলাতে পারো?‌ বেবিসিটার হতে পারবে?‌ স্ত্রীকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাব ভাবছি। সেই রাতে তুমি না হয় আমার বাচ্চাদের সামলে দিও।’‌ 
সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু লোক ‘‌বেবিসিটার–‌‌বেবিসিটার’‌ করে হইচই বাধিয়েছিল। কিন্তু ঋষভ একটি শব্দও খরচ করেননি।
বেবি ফেস। বেবিসিটার। কিন্তু বেচারা নন। 
রেগে গেলে বুঝতে দেন না। হতাশ হলেও না। নিজের ওপর বিশ্বাস অটুট। ঋষভ জানেন, আরও তিন–চারটে বিশ্বকাপ খেলার দক্ষতা আছে তাঁর। সময় পড়ে আছে। পড়ে আছে বয়স। আর আহরণ করার মতো অজস্র অভিজ্ঞতা। তার একটা হল সোমবার রাতে। যখন ঝোড়ো ব্যাটিং করে দিল্লিকে জেতানোর পর মাঠে ঢুকে তাঁকে কোলে তুলে নিলেন টিম মেন্টর সৌরভ গাঙ্গুলি। 
একুশের ঋষভ পন্থ তো বাচ্চাই এখনও। বেবি ফেস। 
কিন্তু বেচারা নন। ‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top