নির্মলকুমার সাহা: ১ মিটার স্প্রিংবোর্ডে রুপো। ১০ মিটার হাইবোর্ডে ব্রোঞ্জ। কয়েক দিন আগে জলন্ধরে সর্বভারতীয় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় জলক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ডাইভিংয়ে এই দুটি পদক জিতেছেন রাখি পোদ্দার। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএসসি ম্যাথমেটিক্স অনার্সের ছাত্রী রাখি আগের বছর এই প্রতিযোগিতায় জিতেছিলেন একটি পদক, ১০ মিটার হাইবোর্ডে ব্রোঞ্জ। অংশ নিয়েছেন গত দু’‌বছর জাতীয় প্রতিযোগিতাতেও ন্যাশনাল সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনের হয়ে। 
রাখিদের বাড়ি নিমতায়। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টার ট্রেন ধরে উত্তর কলকাতার হেদুয়ায় চলে আসেন। সাড়ে ৭টা থেকে টানা ৩ ঘণ্টা অনুশীলন করে চলে যান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখাপড়ার পর্ব চুকিয়ে আবার হেদুয়া। ৪টে থেকে আড়াই ঘণ্টা অনুশীলন। তার পর ক্লান্ত শরীরে ফিরে যান নিমতার বাড়িতে। যেদিন বিশ্ববিদ্যলয়ে ক্লাস থাকে না, দুপুরের সময়টা কাটিয়ে আসেন বাড়িতেই। এটাই রুটিন রাখির। এর মধ্যে অবশ্য কোনও নতুনত্ব নেই। বাংলার অধিকাংশ খেলোয়াড়কে এভাবেই চালাতে হচ্ছে লড়াই। কিন্তু পার্থক্য অন্য জায়গায়। রাখির মা প্রতিমা পোদ্দারের লড়াইটা আরও অনেক কঠিন।
ভোর বা মাঝরাত সাড়ে তিনটেয় নিমতা থেকে ছাড়ে একটি মিনিবাস। গন্তব্য হাওড়া স্টেশন। ওই মিনিবাসের চালক প্রতিমা পোদ্দার। নিমতা–হাওড়া রুটে ৭ বছর ধরে মিনিবাস চালাচ্ছেন তিনি। দুপুরে বাড়ির কাজের জন্য কিছুটা সময় বন্ধ থাকে। আবার বিকেল থেকে রাত মিনিবাসের স্টিয়ারিং থাকে প্রতিমার হাতে। ওই বাসেরই কন্ডাক্টর শিবেশ্বর পোদ্দার। যিনি প্রতিমার স্বামী। কখনও কখনও জায়গা বদল হয়। শিবেশ্বর ড্রাইভার, প্রতিমা কন্ডাক্টর। রাখির মা–বাবার প্রতিদিনের রুটিন এটাই। মিনিবাস চালানো শুরুর আগে ৬ বছর প্রতিমা চালিয়েছেন কখনও অ্যাম্বুল্যান্স, কখনও ট্যাক্সি। 
ওঁদের দুই মেয়ে রাখি আর সাথি। রাখি ডাইভার, সাথি জিমন্যাস্ট। মঙ্গলবারই আগ্রায় শুরু হয়েছে জাতীয় স্কুল জিমন্যাস্টিক্স প্রতিযোগিতা। ওখানে বাংলার স্কুল দলের হয়ে অংশ নিচ্ছে সাথি। রাখিও একসময় জিমন্যাস্টিক্স করতেন। ২০১৫ সালে হায়দরাবাদে সিনিয়র জাতীয় জিমন্যাস্টিক্সে বাংলার মহিলা দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সেই দলেও ছিলেন রাখি। পরে চলে আসেন ডাইভিংয়ে। হেদুয়ার ন্যাশনাল সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনে শুরু করেন ট্রেনিং নেওয়া। আগে কোচ ছিলেন সুমন্ত দাস। তিনি মারা যাওয়ার পর কোচিং নেন সুবীর দাস ও সঞ্জয় বসাকের কাছে।
দুই মেয়ের খেলার জন্যই স্বামীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিমা। বললেন, ‘‌আমার লক্ষ্য একটাই, মেয়ে দুটোকে মানুষ করা। তাই লেখাপড়া ও খেলাধুলো দুটোই করাচ্ছি। যাতে ওদের কোনও সমস্যা না হয়, তাই দিনরাত খেটে চলেছি। ওরা প্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই আমার একমাত্র স্বপ্ন।’‌ মায়ের স্বপ্নের কথা অজানা নয় রাখির। বললেন, ‘‌সবার আগে এখন আমার চাই একটা চাকরি। সিআরপিএফে কথাবার্তা হয়েছে। চাকরিটা পেয়ে গেলেই মা–বাবার কষ্টটা কমাতে পারব। লেখাপড়া, খেলাধুলো দুটোতেই আরও বেশি মন দিতে পারব। ছোটবেলা থেকে দেখছি মা–বাবার কষ্ট। চাকরিটা পেলে ওঁদের একটু শান্তি, বিশ্রাম দিতে হবে।’‌ এর পরই ক্ষোভ রাখির, ‘‌ইস্টার্ন রেল, সাউথ ইস্টার্ন রেলে এখন আর মহিলা ডাইভার নেওয়া হচ্ছে না। শুনেছি আগে চাকরি পেয়েই খেলা ছেড়ে দেওয়ার কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে। সেজন্যই ওখানে মহিলা ডাইভার নেওয়া হচ্ছে না। এটা কোনও যুক্তি হল!’

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top