সুরজিৎ সেনগুপ্ত: ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক প্রায় ৪৭ বছরের। এই ক্লাব নিয়ে লিখতে বসলে পাতার পর পাতা ফুরিয়ে গেলেও বোধহয় সব বলা হবে না। 
ইস্টবেঙ্গল ক্লাব আমার মাতৃসম। জীবনে যেটুকু খ্যাতি, সবটাই লাল–হলুদের জন্য। সেই ক্লাব শতবর্ষ পেরিয়ে ১০১ বছরে পা রাখল। লিখতে বসে স্মৃতির ভিড় জমছে। ইস্টবেঙ্গলে সই করার জন্য আমাকে অনশন করতে হয়েছিল। 
১৯৭৩ সালে নভেম্বর বা ডিসেম্বরের এক বিকেলে শান্তদা (মিত্র) আমাকে এক রেস্তোরাঁয় খাওয়াতে নিয়ে গিয়ে ইস্টবেঙ্গলে খেলার প্রস্তাব দিলেন। রাজি হলাম। কিন্তু শান্তদাকে বললাম, মোহনবাগানের হয়ে রোভার্স কাপ খেলে ইস্টবেঙ্গলে সই করব। শৈলেন মান্না কীভাবে জানতে পেরে গিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গলকে কথা দিয়েছি। ছুটেছিলেন হাওড়া স্টেশনে। ট্রেন থেকে আমাকে নামিয়ে সোজা ডায়মন্ড হারবারের সাগরিকা হোটেলে। 
মান্নাদা বলেছিলেন, মোহনবাগানের চুক্তিপত্রে সই করে রোভার্স কাপ খেলতে যেতে। রাজি হইনি। কারণ ইস্টবেঙ্গল কর্তাদের কথা দিয়ে ফেলেছিলাম। মোহনবাগানও ছাড়বে না। শেষপর্যন্ত অনশনে বসলাম। ইস্টবেঙ্গলে খেলার জন্য খাওয়া–দাওয়া বন্ধ করলাম। ইস্টবেঙ্গল কর্তারা বাবাকে বুঝিয়ে–সুজিয়ে থানায় মিসিং ডায়েরি করিয়েছিলেন। আমার অনশন এবং থানায় ডায়েরি— দুইয়ের নিট ফল আমার ইস্টবেঙ্গলে খেলার স্বপ্নপূরণ। প্রথমবার লাল–হলুদ জার্সিটা পরে আয়নার সামনে দঁাড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ।
লাল–হলুদে শুরুর দিকটা ভাল যায়নি। প্রথম একাদশে সেভাবে সুযোগ পেতাম না। মনখারাপ হতো। প্রদীপদা (ব্যানার্জি) আমি, সুভাষ ভৌমিক, প্রসূন ব্যানার্জিকে নিয়ে আলাদা করে অনুশীলন করাতেন বিকেলে। একদিন প্র্যাকটিস শেষে সুভাষ ওর বাড়িতে আমাকে নিয়ে গেল। চারদিন ছিলাম। কিন্তু ফুটবল নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। নিশ্চয়ই প্রদীপদা সেরকম নির্দেশই দিয়েছিলেন। চুটিয়ে আড্ডা দিয়েছিলাম। সিনেমা দেখেছিলাম। চারদিন পর মাঠে ফিরে জানতে পারলাম লিগ বন্ধ। ঘরোয়া লিগ নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছিল। কী কারণে মামলা মনে নেই।
লিগ চালু হওয়ার পর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম। সেই ১৯৭৫ সালের মরশুমটা স্মরণীয় হয়ে রইল। দুটো সংস্থার তরফে সেরা ফুটবলারের পুরস্কার পেলাম। সন্তোষ ট্রফিতে টুর্নামেন্টের সেরা হলাম। বুঝলাম, প্রদীপদার ভোকাল টনিক এবং সুভাষের বাড়িতে সময় কাটানোটা কাজে লেগেছে।
ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি হল। মাঝে কর্তাদের ওপর অভিমান করে মহমেডানে সই করেছিলাম। অনেকে বলেছিলেন, টাকার লোভে গিয়েছিলাম। সম্পূর্ণ ভুল। ১৯৭৮ সালে ইস্টবেঙ্গলের অধিনায়ক হলাম। দায়িত্ব আরও বাড়ল। কর্তারা বললেন, সাবির আলির সঙ্গে কথা বলে ওকে ইস্টবেঙ্গলে সই করাতে। প্রথমে রাজি হইনি। তারপর ভাবলাম, সিনিয়র ফুটবলার হিসেবে ওটা আমার কর্তব্য। জাতীয় শিবিরে সাবিরের সঙ্গে কথা বলে ওকে রাজি করিয়েছিলাম।
এখনও ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক একইরকম। দেবব্রত সরকার, রাজা গুহ ডাকলেই ক্লাবে যাই। প্রাণের ক্লাবের আইএসএল খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আইএসএল খেলতে না পারলে পিছিয়ে পড়বে ইস্টবেঙ্গল। খেলতে পারলে মনে করব, আমাদের সকলের প্রার্থনা কাজে এসেছে।‌(ফাইল ছবি)

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top