ভাস্বর গোস্বামী
একসময় হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। চার–‌পাঁচ মাস ধরে একের পর এক ই–‌মেল পাঠিয়ে গেছি। কোনও উত্তর আসছে না। এক, আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের অধিকাংশই ইংরেজি জানে না। দুই, দু–একজন জানলেও গুরুত্ব দেয় না। ভারত থেকে যাওয়া ই–‌মেলের উত্তর দিতে ওদের বয়েই গেছে। আর বোধহয় মারাদোনাকে আনা গেল না। এমন সময় হঠাৎ এল সেবাস্টিয়ানের সেই ই–‌মেলটা। জানাল, ফেডারেশন থেকে তার কাছেই মেলগুলো পাঠানো হয়েছে।
হাতে যেন চাঁদ পেলাম। সেবাস্টিয়ানের সঙ্গেই ফোনাফুনি শুরু হল। কিন্তু সেবাস্টিয়ান জানাল, টাকাটা দিয়েগোর কাছে কোনও ফ্যাক্টর নয়। তাই টাকার টোপ দিয়ে তাঁকে রাজি করানো যাবে না। তাঁর কাছে নানা দেশের আমন্ত্রণ আসে। লোভনীয় প্রস্তাব আসে। তিনি খুবই ঘরকুনো। সহজে কোথাও বেরোতে চান না। এত দেশের আমন্ত্রণ থাকতে খামোখা ইন্ডিয়ায় যাবেন কেন?
আবার মাথায় হাত পড়ল। উপায় কী?‌ বিভিন্ন ছবি, ভিডিও দিয়ে একটা প্রেজেন্টেশন বানালাম। বোঝালাম, আর্জেন্টিনার বাইরে পৃথিবীর কোথাও যদি মারাদোনার সবথেকে বেশি ফ্যান থাকে, তবে তা ভারতে। আমরা ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকতে পারি। কিন্তু আবেগ–‌উন্মাদনায় সবার থেকে এগিয়ে। পথচলতি মানুষের সাক্ষাৎকার নিলাম। তাঁরা জানালেন, মারাদোনা তাঁদের কাছে ঈশ্বর। সেই প্রেজেন্টেশন পাঠানো হল আর্জেন্টিনায়। শোনা যায়, সেই ভিডিও দেখে মারাদোনা নাকি প্রাথমিকভাবে রাজি হয়েছিলেন। 
কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই চলে গেলাম বুয়েনস এয়ার্সে। গিয়েই শুনলাম, মারাদোনা আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের কোচ হয়েছেন। এ তো দারুণ খবর। কিন্তু আমাদের জন্য বোধহয় দারুণ নয়। কারণ, হঠাৎ ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। আগামী দু–‌তিনদিন পাওয়া যাবে না। ঈশ্বরদর্শন করতে গিয়ে অধৈর্য হলে চলে!‌ সেই ফাঁকে ক্লদিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক দিকটা সেরে নিলাম। চুক্তির প্রতিটি ক্লজ খুঁটিয়ে দেখলেন ক্লদিয়া। তারপর পেলাম সেই ‘ঈশ্বর’–এর দর্শন। সেই বাড়িতে, যেখানে ক্লদিয়ার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। আমাদের জন্য বরাদ্দ ছিল অল্প সময়। কিন্তু মারাদোনা কবেই বা আর হিসেবি ছিলেন!‌ এটা–‌সেটা গল্প জুড়ে দিলেন। কথায় কথায় দু’‌ঘণ্টা কেটে গেল। আমরা অধিকাংশ কথাই বুঝতে পারছি না। আমাদের অস্বস্তি দেখে সেবাস্টিয়ানকে বললেন, আমি তো বলে যাচ্ছি। ওদের ইংরেজিতে বুঝিয়ে দাও। নইলে ওরা বুঝবে কী করে!‌
তিনি তখন আপন বেগে পাগলপারা। চুক্তি নিয়ে, টাকার অঙ্ক নিয়ে কোনও আগ্রহই নেই। অন্ধের মতো সই করে দিলেন। আসলে, বিয়ে ভেঙে গেলেও তখনও অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন ক্লদিয়াকে। কিন্তু এত খামখেয়ালি লোক। চুক্তি নিয়ে কথাই বললেন না। শেষমেশ যাবেন তো!‌ সেবাস্টিয়ান আশ্বস্ত করল, কোনও চিন্তা কোরো না। ক্লদিয়া যখন চূড়ান্ত করেছে, ও ঠিক যাবে। 
তারপর কী হয়েছিল, সে তো ইতিহাস। ভাবতে ভাল লাগছে, সেদিন নাছোড়বান্দা আবেগ নিয়ে ঝাঁপিয়েছিলাম বলেই মারাদোনাকে ভারতে আনতে পেরেছিলাম।‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top