দেবাশিস দত্ত, লন্ডন: ১৯৭৫, ১৯৭৯ এবং ১৯৮৩— তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে তিনি ছিলেন লর্ডসের ২২ গজের কাছাকাছি। তখন তাঁকে চিনতেন সবাই। সবাই জানতেন শ্রদ্ধেয় আম্পায়ার ডিকি বার্ডের নাম। ভেবেছিলাম, তিনি রবিবার বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে আসবেন। কিন্তু আসেননি। ইয়র্কশায়ারের বাড়িতেও ছিলেন না। মোবাইলে তঁাকে যখন ধরলাম, তখন ইংল্যান্ড একটা উইকেট তুলে নিয়েছে। ডিকি ছিলেন সমারসেটের টনটন মাঠে। ইংল্যান্ড এবং ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের তথ্যচিত্রের জন্য তঁার ইন্টারভিউ দিতে। মিনিট পনেরো পরে আবার যখন যোগাযোগ করা গেল, তখন বলতে শুরু করলেন, ‘‌নিউজিল্যান্ডকে হিসেবের মধ্যে রাখবেন। ক্রিকেটের ছাত্র হিসেবে বলতে পারি, বহুদিন ধরে ইংল্যান্ডের মাঠে নিউজিল্যান্ড ট্রফি জেতার চেষ্টা করছে।’‌
৮৩–র বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ মুহূর্তে মহিন্দার অমরনাথের বলে এলবিডব্লু হয়েছিলেন মাইকেল হোল্ডিং। ডিকি আঙুল তুলে দিয়েছিলেন সঙ্গে সঙ্গে। গোটা মাঠে ভারতীয় সমর্থকরা নেমে এসেছিলেন। ডিকি সেই দৃশ্য দেখেছেন। টেলিভিশনে। এখন ৮৭ বছর বয়স। একাই থাকেন। তবে বিছানার পাশে তঁার ব্যবহৃত সাদা কোট, কালো প্যান্ট এবং টুপিটা ঝোলানো থাকে। যেন একটু পরেই আম্পায়ারিং করতে নামবেন।
’৮৩–র ফাইনাল প্রসঙ্গে ডিকির স্মৃতিচারণ, ‘‌আমি কিন্তু ফাইনালের আগের দিন কপিলদেবকে বলে দিয়েছিলাম, তোমরাই জিতছ। কারণ, ম্যাঞ্চেস্টারে গ্রুপ লিগের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে দিয়েছিল ভারত। একটা ঝিলিক দেখতে পাচ্ছিলাম ওদের খেলায়। তাই মনে হয়েছিল ভারতই চ্যাম্পিয়ন হবে। হোল্ডিং এলবিডব্লু ছিল কিনা, এটা আপনাদের এখনকার থার্ড আম্পায়ার, ফোর্থ আম্পায়ার, প্রয়োজনে ফিফ্‌থ আম্পায়ার লাগিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন। লাভ হবে না। কারণ, সেদিন পরিষ্কার এলবিডব্লু ছিল হোল্ডিং। এত তাড়াতাড়ি আঙুল তুলেছিলাম কীভাবে?‌ ভেরি সিম্প্‌ল। সিক্সথ সেন্স। যা আগাম জানিয়ে দিয়েছিল, মাইকেল হোল্ডিং ওয়াজ আউট।’‌
ডিকি বার্ডের আত্মজীবনী সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইয়ের একটি। সেখানেই লিখেছিলেন, সুনীল গাভাসকার তঁার দেখা সেরা ওপেনার, ‘‌বিউটিফুল ব্যাটসম্যান। সোজা ব্যাট, মাথা স্থির, ছোটখাটো শরীরে ছিল যেন আস্ত ব্যাকরণ বই। এমন টেস্ট ওপেনার হয়নি। হবেও না। আমার দেখা সেরা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় শচীন তেন্ডুলকারও থাকবে। তবে বিরাট কোহলিকে রাখতে পারছি না। কারণ, আমি ওর খেলায় আম্পায়ারিং করিনি কখনও। ২২ গজ দূর থেকে যেসব ব্যাটসম্যানের খেলা দেখেছি, শুধু তাদের নিয়েই আলোচনা করেছি বইতে।’‌
এ আমলের সেরা আম্পায়ার‌ বেছে নিতে বলায় হেসে নিলেন একচোট, ‘‌কাকে বেছে নিই বলুন তো?‌ এখন তো আম্পায়ারিং করতে হয় না। কোনও সম্মান আছে এখনকার আম্পায়ারদের?‌ যে কোনও সিদ্ধান্তই নিরাপদ থাকার জন্য থার্ড আম্পায়ারের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। উপায়ও নেই। ওটাই একমাত্র রাস্তা। আইসিসি–ও সেটাই চাইছে। তো মাঠের আম্পায়াররা আর কী করবে?‌ আইসিসি–র কথা শুনলে ওদের বদনাম হবে না। প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে থার্ড বা ফোর্থ আম্পায়ারের কাছে সিদ্ধান্ত পাঠিয়ে দিচ্ছে। জানি না, এভাবে কতটা উন্নতি হবে ক্রিকেটের। হয়তো বিতর্ক কমবে। কিন্তু আম্পায়ারদের গুরুত্ব কমছে। আইসিসি রিমোট কন্ট্রোলে ম্যাচ পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব টেকনিক্যাল ব্যাপার–‌স্যাপার আমাদের আমলে ছিল না। তবুও আমাদের দিকে বিশেষ কেউ আঙুল তুলতে পারেনি।’‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top