গ্রেগ চ্যাপেল বলেছিলেন, তাঁকে দিয়ে কিস্যু হবে না। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে নির্ভরতা এনে দিয়েছেন সেই দীপক চাহারই। তঁার যাত্রাপথ ফিরে দেখলেন অনির্বাণ সেনগুপ্ত।

সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে তাঁর মিল কোথায়?‌ দু’‌জনের কামব্যাকের পেছনেই বিরাট ভূমিকা গ্রেগ চ্যাপেলের। 
প্রথমে অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়া। পরে একদিনের এবং টেস্ট দল থেকে সৌরভকে বাদ দিয়েছিলেন গ্রেগ। সেই অবস্থা থেকে সৌরভের ঘুরে দঁাড়ানোর কাহিনি গোটা দেশের মুখস্থ। কিন্তু তঁার— দীপক চাহারের কাহিনি সেভাবে সম্ভবত কেউ জানে না। 
সালটা ২০০৮। গ্রেগ তখন রাজস্থান ক্রিকেট সংস্থার অ্যাকাডেমির ডিরেক্টর। ট্রায়াল থেকেই এক তরুণ ডানহাতি জোরে বোলারকে ছেঁটে ফেলেন। বলে দেন, এ ছেলেকে দিয়ে কিস্যু হবে না। ক্রিকেটে ওর কোনও ভবিষ্যৎ নেই। শুনে ভেঙে পড়েছিলেন সেই তরুণ। এই পরিস্থিতিতে হাল ছেড়ে পালানোর রাস্তায় পা বাড়ান অনেকে। কিন্তু দীপক হতাশাকে পরিণত করেছিলেন শপথে। 
ভারতের প্রাক্তন ওপেনার আকাশ চোপড়াকে অনেকে এখন ধন্যবাদ দিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। জহুরি জহর চেনে। যেমন আকাশ চিনেছিলেন দীপককে। ২০১০ সালের শুরুতে রাজস্থানের এই পেসারকে দেখে আকাশ টুইট করেছিলেন, ‘‌আমি এক তরুণ প্রতিভা খুঁজে পেয়েছি। দীপক চাহার। নামটা মনে রাখুন। ভবিষ্যতের অনেক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে ওর মধ্যে’‌। 
৯ বছর পর মিলে গিয়েছে আকাশের সেই ভবিষ্যদ্বাণী। 
প্রতিভার ছাপ দীপক রেখেছিলেন ২০১০ সালেই। ১ নভেম্বর জয়পুরে রনজি ট্রফির ম্যাচে হায়দরাবাদকে লজ্জায় মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিলেন দীপক। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে সেদিনই অভিষেক হয়েছিল তঁার। ১০ রানে ৮ উইকেট নিয়েছিলেন। হায়দরাবাদ অল আউট হয়েছিল ২১ রানে! রনজি ট্রফির ইতিহাসে সর্বনিম্ন রান। দ্বিতীয় ইনিংসেও ৪ উইকেট নেন দীপক। 
১১ বছর বয়সে কোচ নবেন্দু ত্যাগীর অ্যাকাডেমিতে হাতেখড়ি হয়েছিল দীপকের। বাড়ি থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে সেই অ্যাকাডেমিতে প্রতিদিন ছেলেকে নিয়ে পৌঁছে যেতেন বাবা লোকেন্দ্রসিং চাহার। দীপকের প্রতিভার সন্ধান যিনি আগেই পেয়েছিলেন। লোকেন্দ্রসিংয়ের ইচ্ছে ছিল ক্রিকেটার হওয়ার। সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। অপূর্ণ ইচ্ছে তিনি পূরণ করার সংকল্প নিয়েছিলেন ছেলের মাধ্যমে। ভারতীয় বায়ুসেনার কর্মী লোকেন্দ্রসিং চাকরি ছেড়ে দেন ছেলের জন্য। বাড়িতেই বানিয়ে ফেলেন কংক্রিট ও টার্ফের দুটি পিচ। দীপকও নিজেকে ডুবিয়ে দেন প্র‌্যাকটিসে। লোকেন্দ্রসিং ছেলের হাতে তুলে দিতেন নতুন বল। যাতে দীপক সুইংয়ে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠতে পারেন। বল একটু পুরনো হলেই তা নিয়ে নিতেন বাবা। আবার দিতেন নতুন বল। যে কারণে, নবেন্দু বলেছেন, ‘‌১৫ বছর বয়সেই সুইং বলের মাস্টার হয়ে উঠেছিল দীপক।’‌ 
দিনের পাশাপাশি রাতের আলোতেও দীপকের প্র‌্যাকটিসের ব্যবস্থা করেছিলেন লোকেন্দ্রসিং। কয়েকটা বাঁশ পুঁতে সেগুলোর মাথায় লাগিয়ে দিয়েছিলেন আলো। সেই আলোতেই রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্র‌্যাকটিস করতেন দীপক। উইকেটের দু’‌দিকেই সুইং করানোর অদ্ভুত দক্ষতা রয়েছে তঁার। 
হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে অভিষেক ম্যাচে দীপকের সঙ্গী ছিলেন পঙ্কজ সিং। তিনি বলেছেন, ‘দীপকের সব সময় লক্ষ্য থাকত উইকেট নেওয়া। সেটা করতে গিয়ে ও তখনকার কোচ হৃষিকেশ কানিতকার আর অধিনায়কের কাছে বকা খেয়েছে। ও দু’‌দিকেই সুইং করানোর চেষ্টা করত। কোনও কোনও সময়ে তা কাজে লাগেনি। মার খেয়েছে। ওকে বলা হয়েছে নির্দিষ্ট একটা লাইনে বল করতে। কিন্তু দীপক নিজের ওপরই আস্থা রেখেছে। এখন এই দক্ষতাই দীপকের মূল শক্তি। সুইংয়ের ওপর ওর নিয়ন্ত্রণও অসাধারণ।’
২০১৬–র অক্টোবরে জয়পুরে রাজস্থান ক্রিকেটের ডেভেলপমেন্ট ক্যাম্পে দুই আন্তর্জাতিক কোচ ইয়ান লেসলি পন্ট এবং ক্যাথরিন ক্লেয়ার ডালটনের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন দীপক। কিন্তু আগ্রাজাত সাতাশ বছরের যুবকের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল ২০১৮। আইপিএলে তাঁকে ৮০ লক্ষ টাকা দিয়ে কেনে চেন্নাই সুপার কিংস। রাইজিং পুনে সুপারজায়ান্টসে থাকার সময়ই মহেন্দ্র সিং ধোনির নজরে পড়ে যান দীপক। ২০১৮–য় ডোয়েন ব্রাভো না থাকায় পাওয়ার প্লে ওভারের পাশাপাশি ডেথ ওভারেও ধোনি অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়েছিলেন তঁাকে। সুইং সহায়ক নয়, এমন উইকেটে কীভাবে ওয়াইড ইয়র্কার, ওয়াইড স্লোয়ার দিতে হয়, শিখেছিলেন দীপক। নতুন বলে তঁার দক্ষতার কথা অজানা নয়, কিন্তু ডেথ ওভারেও তিনি যে কার্যকরী হয়ে উঠছেন, তার প্রমাণ রেখেছেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সদ্যসমাপ্ত টি২০ সিরিজে। 
গত আইপিএলে ডেথ ওভারে বল করতে গিয়ে ধোনির কাছে ধমক খেয়েছিলেন দীপক। ম্যাচ ছিল কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে। ১৯তম ওভারে দীপকের হাতে বল তুলে দেন সিএসকে অধিনায়ক ধোনি। দীপক পরপর দুটো নো বল করায় দুটো ফ্রি হিট পেয়ে যায় কিংস ইলেভেন। ‘‌ক্যাপ্টেন কুল’‌ ধোনি মাঠে মৃদু তিরষ্কার করেন দীপককে। কিন্তু সেই ঘটনার থেকে নেওয়া শিক্ষা অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে দীপককে। তঁার কথায়, ‘‌ডেথ ওভারে প্রথম বল করেছিলাম সেবার। তার আগে কেউ আমাকে ডেথে ব্যবহার করেনি। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ওভার ছিল। দুটো নো বল করেছিলাম। বল সিলেকশনে ও (‌ধোনি)‌ রেগে গিয়েছিল। কিন্তু ওর বকুনি থেকে শিখেছি। তারপর মাত্র ৬ রান দিয়েছিলাম। ম্যাচটাও জিতেছিলাম। সেই থেকে প্রতি ম্যাচে ১৯তম ওভার আমিই করেছি। আত্মবিশ্বাসটা মাহিভাই এনে দিয়েছিল।’‌
আইপিএলে গত দুই মরশুমে ৩২ উইকেট। ঘরোয়া ক্রিকেটেও ধারাবাহিক। এইমুহূর্তে ভারতের টি২০ দলে নিয়মিত সদস্য। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিশ্বরেকর্ড। ৭ রানে ৬ উইকেট। প্রথম পুরুষ ভারতীয় হিসেবে টি২০ আন্তর্জাতিকে হ্যাটট্রিক। ৪৮ ঘণ্টা পরেই সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে বিদর্ভের বিরুদ্ধে ওভারে ৪ উইকেট। দু’‌দিন পর উত্তরপ্রদেশের বিরুদ্ধে ওভারে ৩ উইকেট। মুক্তো ছড়াচ্ছেন দীপক। গুরু গ্রেগ যঁার সম্পর্কে একদা বলেছিলেন, ‘একে দিয়ে কিস্যু হবে না!’
 

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top