বয়স তাঁর কাছে শুধু একটা সংখ্যা। ৩০ জানুয়ারি মোহনবাগান ক্লাবে ৯০তম জন্মদিন পালিত হবে তাঁর। আবেগ–অভিমান শুনে এলেন মুনাল চট্টোপাধ্যায়।

 পড়ছিলেন ডাক্তারি। কেন হয়ে গেলেন পুরোপুরি ফুটবলার?‌ 
বদ্রু ব্যানার্জি:‌ আর জি কর মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়তে পড়তেই সর্বভারতীয় দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হলে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় অভিনন্দন জানান। কিন্তু তৃতীয় বর্ষের পর ডাক্তারি পড়া চালানো সম্ভব হয়নি। ফুটবল খেলার জন্য দেশে–‌বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হচ্ছিল। পড়ায় মন দেওয়া সম্ভব ছিল না। ফুটবল ছাড়া অসম্ভব ছিল। ডাক্তার হওয়ার বাসনাটাই ছাড়লাম।
 বাড়ি থেকে এমন একটা সিদ্ধান্ত মেনে নিল?‌ বাধা আসেনি?‌ 
বদ্রু:‌ একটা সময় বাড়িতে কেউ চায়নি আমি ফুটবল খেলি। আমার বড়দা রাধানাথ ফুটবল খেলতে গিয়ে মাঠেই প্রাণ হারান এক প্রতিপক্ষ ফুটবলারের সঙ্গে সংঘর্ষে। তাঁর বিয়ের সাতদিনের মধ্যে। বাবা চাননি পরিবারে আর কেউ ফুটবল খেলুক। খেলতে যেতাম স্কুলের ব্যাগে জার্সি–বুট লুকিয়ে। কখনও ছাতার মধ্যে ঢুকিয়ে। কখনও চটের থলেতে খেলার সরঞ্জাম ভরে বাড়ির নীচে দাঁড়ানো বন্ধুদের হাত দিয়ে মাঠে পাচার করতাম। পরে সেটা জানাজানি হতে বাবার হাতে মারও খেয়েছি। তবে খেলা ছাড়িনি। মোহনবাগানে খেলা শুরু করতে আর কোনও আপত্তি আসেনি।
 ১৯৫২ সালে মোহনবাগানে কে নিয়ে এসেছিলেন?‌
বদ্রু:‌‌ ফুটবল জীবন শুরু বালি প্রতিভায়। সেখান থেকে বি এন আর। মোহনবাগানে আসাটা গল্পের মতো। ইউনিভার্সিটি মাঠে আশুতোষ কলেজের বিরুদ্ধে খেলছিলাম আর জি করের হয়ে। আমার গোলে টিম চ্যাম্পিয়ন হল। ম্যাচ শেষে এক বন্ধু বলল, মান্নাদা (‌শৈলেন মান্না)‌, কুমারবাবু অপেক্ষা করে আছেন। আমি যেতেই মান্নাদা বললেন গাড়িতে উঠে মোহনবাগান তাঁবুতে গিয়ে সই করতে। মোহনবাগানের হয়ে খেলা স্বপ্নের মতো। তবু মান্নাদাকে বলি, বাবার অনুমতি না নিয়ে পাকা কথা দিতে পারব না। ওঁরা আমায় নিয়ে বাড়ি গেলেন। বাবা আশীর্বাদ করে বললেন, এমন সুযোগ কম আসে। মোহনবাগান জার্সির মান রেখো।
 বাগানে ৫৯ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে স্মরণীয় বছর কোনটা?‌ আপনার দেখা সেরা কোচ কে? আর সেরা জুড়িদার? কোন ডিফেন্ডারকে টপকাতে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয়েছে?‌
বদ্রু:‌‌ ৫২–তে আই এফ এ শিল্ডে রাজস্থানের সঙ্গে যুগ্মজয়ী হই। ৫৩–য় মোহনবাগান প্রথমবার ডুরান্ড জেতে। সেমিফাইনাল, ফাইনালে গোল করি। ৫৪–য় কলকাতা লিগ ও শিল্ড জিতে প্রথম ডাবল। শিল্ড ফাইনালে হায়দরাবাদ পুলিশ হারে আমার গোলে। ৫৫–য় প্রথম রোভার্স জয়। ৫৬ সালটা সবচেয়ে স্মরণীয়। মোহনবাগান জার্সিতে দ্বিতীয়বার ডাবল খেতাব। ওই বছরই মেলবোর্ন অলিম্পিকে ভারতীয় দলের অধিনায়ক হয়ে প্রথম এশিয়ান দল হিসেবে অলিম্পিক সেমিফাইনালে ওঠার কৃতিত্ব অর্জন করি। ৫২ থেকে ৫৬ বাংলার হয়ে সন্তোষ ট্রফি খেলি। ৫৩ আর ৫৫–য় চ্যাম্পিয়ন। ৫৬–তেই বাংলার নেতৃত্ব। ৬১–তে আমার কোচিংয়ে সন্তোষ ট্রফি জেতে বাংলা। ৫৮–য় মোহনবাগানের অধিনায়ক হই। কিন্তু তিনটে ট্রফিতেই রানার্স। চ্যাম্পিয়ন না হওয়ার আপসোস রয়ে গেছে। সেরা কোচ রহিম সাহেব। যেমন ডিসিপ্লিন্‌ড, তেমন দুর্দান্ত ট্যাকটিশিয়ান। ভারতীয় ফুটবলে নতুন ছকের প্রবর্তক তিনিই। আর আমার সেরা জুড়িদার ছিল কেষ্ট পাল। স্ট্রং হেডার। গোলকিপারদের খুব বিরক্ত করত। ব্যস্ত রাখত। সেই ফাঁকে অনেক গোল করেছি। টপকাতে বেগ পেয়েছি জর্জের মোনা ঘোষকে। খুব রাফ অ্যান্ড টাফ খেলত।
 ৫২ থেকে ৬০। আরও কিছুদিন কি খেলতে পারতেন না?‌ 
বদ্রু:‌‌ পারতাম। কিন্তু এর পেছনে একাধিক কারণ আছে। ক্লাব রাজনীতির বিষয়ে এতদিন পর কিছু না বলাই ভাল। এটুকু বলতে পারি, আপোস বা তোষামোদের রাস্তায় কোনওদিন হাঁটিনি। তাই বড় দলের কোচিং করারও সুযোগ পাইনি। ৫৮–য় বার্মা শেলের চাকরিতে যোগ দেওয়ার সমস্যা ছিল। শিলিগুড়িতে পোস্টিং। কথায় কথায় বিমানে এসে প্র‌্যাকটিস করা বা ম্যাচ খেলা সম্ভব হয়নি বেশিদিন। শেষপর্যন্ত খেলা ছাড়ি। পরে চাকরি ছেড়ে ট্রেনের প্যান্টোগ্রাফের স্পেয়ার পার্টস তৈরির কারখানা গড়ি। সেই ব্যবসা এত বেড়ে গিয়েছিল যে, খেলার জগতে মন আর দিতে পারিনি।
 প্রতিবাদী চরিত্র আপনি। বাগান সদস্যপদ ছাড়লেন কেন?‌
বদ্রু:‌‌ মোহনবাগান শুধু একটা ফুটবল ক্লাব নয়, একটা প্রতিষ্ঠান। আমার কাছে মন্দিরের মতো। সেটা কলুষিত হলে সহ্য করতে পারব না। কুখ্যাত এক টুর্নামেন্টে মোহনবাগানের নাম গড়াপেটায় জড়ানোয় সদস্যপদ ছেড়ে দিই। পরে মোহনবাগান জাতীয় লিগ জয়ের পর সংবর্ধনার আসরে টুটু (‌বসু)‌ ও অঞ্জন (‌মিত্র)‌ অনুরোধ করল নতুন করে সদস্য হতে। ওদের কথা ঠেলতে পারিনি। 
 এতকিছুর পরও অর্জুন বা পদ্মশ্রী পাননি। মোহনবাগান রত্ন সম্মানটাই কি সেদিক থেকে সেরা প্রাপ্তি?‌
বদ্রু:‌‌ অবশ্যই! মোহনবাগান রত্নই এখনও পর্যন্ত সেরা প্রাপ্তি। অনেক পরs কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রক ৫৬ অলিম্পিকের জীবিত সদস্যদের দিল্লিতে ডেকে সংবর্ধনা দেয়। এর বেশি কিছু স্বীকৃতি জোটেনি। তবে প্রিয় মোহনবাগানেই ৯০তম জন্মদিন পালনের ব্যবস্থা হয়েছে। যাঁদের এই উদ্যোগ তাঁদের ধন্যবাদ।
 এমন একটা সময়ে কার কথা বেশি মনে পড়ছে?‌ 
বদ্রু:‌ কার কথা আলাদা করে বলব? বাবা, মা, দাদা। দাদার অকালমৃত্যুর পর সেই বৌদি, যিনি আমাকে মানুষ করেছিলেন। আমার চিত্রাভিনেত্রী স্ত্রী তপতী। উত্তমকুমারের সঙ্গে চিরকুমার সভা, শাপমোচন, সাগরিকা, অগ্নীশ্বর–সহ বহু হিট ছবিতে অভিনয় করেছিল। ২০১২ সালে তাকে হারিয়েছি। তার আগে ২০০৮–এ একমাত্র ছেলে রাণার মৃত্যুটা আমার আর স্ত্রী–র কাছে ছিল বুকে শেল বেঁধার মতো। তখন থেকে আমার সান্ত্বনা আর বেঁচে থাকার প্রেরণা বৌমা সর্বাণী আর নাতনি সিণ্ডারেলা। ওরাই আমার বন্ধু। ওদের নিয়ে হেসেখেলে চলে যাচ্ছে জীবনটা। আগে বাজার করতাম। এখন আর বাড়ি থেকে বের হই কম। শুধু ব্যাঙ্কে যাই। বাকি সময় কাগজ পড়ে, টিভিতে খবর আর খেলা দেখি।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top