খেলার জন্য বাড়ি ছেড়েছিলেন। ফিরে এসে মন দিলেন পেসারের উপযোগী পিচ তৈরিতে। অধুনা বিসিসিআইয়ের চিফ কিউরেটরকে নিয়ে লিখলেন তরুণ চক্রবর্তী।

বাবাকে রীতিমতো হুমকি দিয়েছিল ছেলেটি, ‘ক্রিকেট খেলতে দাও, নইলে পড়ব না!’
বাবা রাজি হননি। ছেলেও পড়েনি। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল অনেক দূরে। তার আগে জুটিয়ে নিয়েছিল সরকারি চাকরি। কিন্তু সেখানেও মন টেকেনি। আবার চাকরি থেকে পালিয়ে বাড়িতে।
ফিরে এসেও সেই ক্রিকেট। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি নেই। পদে পদে বাধা। জোরে বল করে উইকেট পেলেও ত্রিপুরা ক্রিকেটে তখন স্পিনার–রাজ! হার মানতে হয়েছিল। সেটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল জেদ। সেই জেদই সাফল্যের সোপান হয়ে উঠেছিল অধুনা ভারতের ক্রিকেট দুনিয়ার চিফ কিউরেটরের পদাধিকারী আশিসকুমার ভৌমিকের।
ভালো ছাত্র ছিলেন। বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তিও হয়েছিলেন দ্বাদশ শ্রেণিতে। কিন্তু তখন মাথায় তাঁর একটাই পোকা— ক্রিকেট। ১৯৮৪ সালে ত্রিপুরায় বিসিসিআই–এর ক্যাম্পে ২০ জনের দলে সুযোগ পেয়েছিলেন। বাড়ির লোক রাজি হয়নি। কিন্তু তাঁকে আটকেও রাখতে পারেননি। পড়তে যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে আগে থেকে ঠিক করা চাকরি নিয়ে দে ছুট!
কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের সেই নিশ্চিত চাকরিতেও মন টেকেনি আশিসের। তাই ফিরেছিলেন ঘরে। ক্রিকেট–পিপাসা নিয়েই। আগরতলার ব্লাড মাউথ এবং সংহতি ক্লাবের হয়ে পেস বোলিং করতেন। মরা পিচেও সাফল্য পেতেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২— ক্লাব ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী ছিলেন আশিস। তবু ত্রিপুরার রনজি দলে ঠাঁই হল না তাঁর। কারণ, অঘোষিত নিয়ম ছিল, পেসার থাকবে একজনই। বাকি চারজন স্পিনার। ১৮ জনের দলে থেকেও রনজি খেলা হয়নি। কিন্তু দুঃখ পুষে রেখে বিবাগী হওয়ার বান্দা অবশ্য আশিস নন। বরং তিনি সেই লোক, যিনি সিস্টেমকে আঘাত করতে চান।
ঠিক করলেন, পেসারদের উপযোগী পিচ তৈরিতে মন দেবেন। সুযোগও এল। ১৯৯৭ সালে বিসিসিআই ঠিক করল, প্রশিক্ষিত কিউরেটর তৈরি করবে। ত্রিপুরা থেকে সুযোগ পেলেন আশিস। মন দিলেন পেসার তৈরির উপযোগী পিচ তৈরি করতে। জীবিকা হিসাবে বেছে নিলেন ঠিকাদারি। সেখানেও বিপদ। ত্রিপুরা তখন জঙ্গি সমস্যায় জর্জরিত। পাহাড়ি এলাকায় কেউ যেতে সাহস পায় না। আশিস গেলেন। উপজাতিদের মন জয় করলেন। চাকমা আর লুসাই উপজাতিদের ঘরের ছেলে হয়ে উঠলেন ‘বাপি’। 
কিন্তু সেখানেও তাঁর মন টিকল না।
হয়ে গেলেন চিত্রসাংবাদিক। হাতেখড়ি হল ‘ফ্রন্টলাইন’ ম্যাগাজিনে। রাজীব গান্ধীর হত্যাদৃশ্যের ছবি ছেপে যে ম্যাগাজিন গোটা দুনিয়ায় সাড়া ফেলেছিল। একইসঙ্গে শুরু করলেন ত্রিপুরায় এক রাজনৈতিক দলের ছবি তোলার মুখপত্রে কাজ। সঙ্গে প্রতিবেদন। টানা পাঁচবছর সাংবাদিকতা করলেন। সঙ্গে ক্যুরিয়রের ব্যবসা। সেগুলো অবশ্য নিছকই পেশা। নেশা সেই ক্রিকেট। ত্রিপুরার মিডিয়া ক্রিকেটেও মধ্যমণি ছিলেন তিনি।
জোরে বোলার তৈরির পোকা তখনও তাঁকে ছেড়ে যায়নি। ত্রিপুরার রনজি দলে পেসারের সংখ্যা তো বাড়াতে হবে। ফলে পিচ তৈরি নিয়ে শুরু হল আরও বেশি পড়াশোনা। ২০১২ সালে পূর্বাঞ্চলের একমাত্র প্রশিক্ষিত কিউরেটরের তকমা লেগে গেল তাঁর নামের পাশে। 
ভারতের আধুনিক পিচের জনক দলজিৎ সিংয়েরও নজর ছিল তাঁর প্রিয় শিষ্যের ওপর। গুরুর আস্থার অমর্যাদা করেননি আশিস। বুঝেছিলেন, ভাল পিচ তৈরি করতে হলে মাটি সম্পর্কেও ভাল জ্ঞান থাকা চাই। কাগজে–কলমে দশম পাশ আশিস তাই কখনও ছুটেছেন বম্বে আইআইটি–র বিশ্বনাদমের কাছে, কখনও বেঙ্গালুরু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রামকৃষ্ণনের দরজায়। মাটিকে চিনতে।
২০১৬ সালে বিসিসিআই লেভেল ওয়ান পরীক্ষা নিল পিচ কিউরেটরদের। ৮০.৫ শতাংশ নম্বর নিয়ে প্রথম হলেন আশিস। ততদিনে লোধা কমিটির রিপোর্টে গ্রাউন্ড অ্যান্ড পিচ কমিটির চেয়ারম্যান পদ উঠে গিয়েছে। চালু হয়েছে টেকনিকাল পদ— চিফ কিউরেটর। কপিলদেব, কস্তুরী রঙ্গন, দলজিৎ সিং এবং বেঙ্কট সুন্দরম ছিলেন কমিটিতে। আশিস ছিলেন জোনাল কিউরেটর। পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বে। পাশাপাশি ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে মাটি নিয়ে পড়ানো শুরু করেছিলেন।
সৌরভ গাঙ্গুলি বিসিসিআই সভাপতি হলেন মহা ধুমধামে। তার পাশাপাশিই প্রায় নিঃশব্দে বাঙালিদের জন্য এল আরও এক সুখবর। সেটা এই যে, দেশের ক্রিকেট পিচ তৈরির ভারও থাকছে বাঙালির হাতে। বিসিসিআই–এর চিফ কিউরেটর হলেন আশিস। উত্তর–পূর্বাঞ্চল তো বটেই, দেশের পূর্বাঞ্চল থেকেও কেউ এই পদে এর আগে কখনও বসেননি। 
সৌরভের নির্বাচনের সঙ্গে অবশ্য আশিসের দায়িত্বপ্রাপ্তির কোনও যোগ নেই। ঘটনাপ্রবাহ একেবারেই কাকতালীয়।
বাংলাদেশের কাছে দিল্লির মাঠে টি২০ হেরে গেলেও ক্রিকেটে ভারত ঘরের মাঠে ‘সুপার পাওয়ার’। আশিস তা বিলক্ষণ জানেন। তাঁর চ্যালেঞ্জ বিদেশের মাটিতেও ভারতকে ধারাবাহিক সাফল্য এনে দেওয়া। বিদেশে যেমন পিচে ভারতকে খেলতে হবে, দেশেও তেমন পিচ তৈরি করা। 
পেস বোলার হিসাবে সাফল্য না পাওয়ার দুঃখ যায়নি আশিসের। তবে তাঁর রাজ্য ত্রিপুরায় এখন ১১ জনের দলে ৪ পেসার থাকে। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে তাঁর।
বিনয়ী। হাসিখুশি। তবু তাঁকে নিয়ে বিতর্ক তাঁর নিজের রাজ্যে। একদা রাজনৈতিক দলের মুখপত্রে কাজ করার ‘অপরাধ’–এই নাকি কিছুদিন আগে পূর্বাঞ্চলীয় জোনাল কিউরেটরকে ত্রিপুরায় বিসিসিআইয়ের পরিচালনাধীন মাঠে ঢুকতে দেননি এক প্রশাসক। যিনি ঘটনাচক্রে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। ছাড়েননি আশিস। মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির বিরুদ্ধেও। আপস করতে পারেননি কখনও। পারেন না এখনও। মাটি নিয়েই পাগল পঞ্চাশ–পেরোন মাটির মানুষ। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কল্যাণে পাঁচতারা বা সাততারা জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু মাটির মানুষ আশিসের পা থাকে মাটিতেই।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top