কোথায় দেরাদুন আর কোথায় বনগাঁ। কিন্তু অভিমন্যু ঈশ্বরন সেই সফরও করেছেন ক্রিকেটের জন্য। বঙ্গক্রিকেটের নতুন অধিনায়ককে নিয়ে লিখলেন নজরুল ইসলাম।

বিত্তশালী পরিবারে জন্ম। ঘাম ঝরিয়ে ক্রিকেট খেলার দরকার পড়ত না। ল্যান্ড রোভার বা মার্সিডিজ নিয়ে ঘুরতে পারতেন। অন্তত বনগাঁ লোকালের নিত্যযাত্রী হওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। মহাভারতের অভিমন্যু চক্রব্যূহে ঢোকার রাস্তা জানতেন। কিন্তু এই অভিমন্যু অনেক হাতছানির চক্রব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা জানেন। নইলে কি আর এই জায়গায় পৌঁছতে পারতেন! বড়লোক বাবার বখাটে ছেলের মতো ঘুরে বেড়াতে হত। 
পারিবারিক সম্পত্তি পরিমাণ হাজার কোটিরও বেশি। তিনিই কিনা ভিড়ে ঠাসা বনগাঁ লোকাল ধরে কলকাতায় আসতেন?‌ বাড়ির বৈভব ছেড়ে বছরের পর বছর প্রত্যন্ত বনগাঁয় পড়ে থাকতেন। একটাই লক্ষ্য— বড় ক্রিকেটার হতে হবে।  
বঙ্গক্রিকেটে নামটা অপরিচিত নয়। ১৪ বছর আগে বাংলায় আসা। দেশের ক্রিকেটেও ক্রমশ পরিচিত মুখ। ছ’বছর রনজি খেলছেন, অনূর্ধ্ব ২৩ ভারতীয় দলের নিয়মিত সদস্য, ভারতীয় ‘এ’‌ দলেও খেলে ফেলেছেন। অথচ সাফল্যে আবেগে ভেসে বেড়ান না। উল্টে ব্যর্থতায় এখনও শিশুর মতো কেঁদে ফেলেন। বৈভবের আস্ফালন নেই। রনজিতে দুরন্ত ইনিংস খেলেও অনায়াসে ট্যাক্সি ডেকে আস্তানায় ফিরতে পারেন। বন্ধুদের সঙ্গে হৈ–হুল্লোড় বা পার্টিতে নেই। ক্রিকেটের বাইরে কিছু ভাবতে পারেন না। মাঠ ছাড়া কিছু চেনেন না। অন্তর্মুখী। অনায়াসে কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে থাকতে পারেন। কিন্তু একা থাকতে ভয় পান। তাই আপাতত ঠিকানা ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্‌সে বন্ধু ঋত্বিক রায়চৌধুরির বাড়িতে।
১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দেরাদুনের কাছে মালসি নামে এক ছোট্ট পাহাড়ি জনপদে জন্ম। বাবা আর পি ঈশ্বরণ নামী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। এই ছেলের জীবনের কক্ষপথে পশ্চিমবঙ্গ আসার কথাই নয়। কিন্তু এসে গেল। কারণ, নির্মাল্য সেনগুপ্ত। কলকাতা ময়দান যাঁকে ‘অপুদা’‌ নামে চেনে। ক্রিকেটের কোচ। বনগাঁয় অ্যাকাডেমি আছে। ২০০৫ সালে দল নিয়ে দিল্লিতে খেলতে গিয়েছিলেন। বন্ধু গুরপ্রীত সিং হ্যারি বায়না ধরেছিলেন, তাঁর এক বন্ধুর ছেলেকে ক্রিকেট শেখাতে হবে। কিন্তু নির্মাল্য থাকেন বনগাঁয়, আর সেই ছেলে দেরাদুনে। কীভাবে সম্ভব?‌ দেরাদুনে কোচের কি এত অভাব?‌ নির্মাল্য হ্যারির পাশাপাশি প্রশ্ন করেছিলেন অভিমন্যুর বাবাকেও। 
কিন্তু চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট একদিন ছেলেকে নিয়ে বনগাঁয় হাজির। তিনদিন সেখানে থেকে অভিমন্যু সামান্য ক্রিকেটপাঠ পেয়েছিলেন নির্মাল্যর থেকে। তাতেই মুগ্ধ আর পি ঈশ্বরণ। নির্মাল্যর কাছে জেদ ধরেছিলেন, ‘আপনাকেই শেখাতে হবে। দেরাদুন চলুন। ওখানে থেকে অভিমন্যুকে ক্রিকেট শেখাবেন।’‌ 
পাকাপাকি দেরাদুন গিয়ে থাকা সম্ভব ছিল না নির্মাল্যর পক্ষে। শেষপর্যন্ত মাসে ১৫ দিন গিয়ে কোচিং করাতে রাজি হন। সেটা চলে বছরখানেক। তারপর আর সম্ভব হয়নি। অতএব, বাবা পাকাপাকিভাবে ছেলেকে পাঠিয়ে দিলেন বনগাঁয়। 
২০০৬ সাল থেকেই অভিমন্যুর ঠিকানা বনগাঁ। ক্রিকেটপাঠের জায়গা বনগাঁ ক্রিকেট অ্যাকাডেমি। কখনও বনগাঁ লোকাল আর কখনও ভাড়া–করা গাড়িতে কলকাতা ময়দানে আসা–যাওয়া। নির্মাল্যর তত্ত্বাবধানে নিজেকে তৈরি করার পর শুরু হল প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের লড়াই। প্রথম অনূর্ধ্ব ১৩ অম্বর রায় ক্রিকেট। বিভিন্ন দলের হয়ে খেলা শুরু করলেন অভিমন্যু। যখন যে দলের হয়ে মাঠে নামেন, সেই দলই চ্যাম্পিয়ন। এরপর বাংলার বয়সভিত্তিক দলে সুযোগ। যেখানে প্রতিবছরই বর্ষসেরা ক্রিকেটারের স্বীকৃতি। ক্রমে বাংলা দলে খেলার সুযোগ। 
‌২০১৩–’১৪ মরশুমে রনজি অভিষেকে উত্তরপ্রদেশের বিরুদ্ধে ইডেনে দুই ইনিংসেই ব্যর্থ। প্রথম মরশুমটা ভাল যায়নি। পরে অবশ্য আর ঘুরে তাকাতে হয়নি। নিজেকে বাংলার ব্যাটিংয়ে অন্যতম সেরা স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১২টি সেঞ্চুরি, ১৭টি হাফসেঞ্চুরি। গড় ৫০–এর ওপর। মাস তিনেক আগে ভারত ‘এ’‌ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা ‘এ’‌ দলের বিরুদ্ধে করেছেন জীবনের সর্বোচ্চ ২৩৩। এই সেদিনও দলীপ ফাইনালে করলেন ১৫৩ রান। ঘটনাচক্রে, তার আগেই তাঁকে করা হয়েছে বাংলার অধিনায়ক।
গত মরশুমে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ১৮৬। দিল্লির বিরুদ্ধে অপরাজিত ১৮৩। রনজিতে ৬ ম্যাচে ৮৬১ রান করে জাতীয় নির্বাচকদের নজরে পড়েন। নির্বাচকরা বাংলার তরুণ ব্যাটসম্যানকে দেওধর ট্রফিতে সুযোগ দেন।  ভারতীয় ‘এ’‌ দলের হয়ে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড ‘এ’‌ দলের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পান। বিদেশের ক্রিকেট লিগে খেলার অভিজ্ঞতাও ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। খেলেছেন ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে প্রাইম ব্যাঙ্কের হয়ে। সেরা পারফরমেন্সও করেছেন। যদিও তাঁর গায়ে সেঁটে গেছে লাল বলের ক্রিকেটারের তকমা। 
চেতেশ্বর পুজারাকে যেমন সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ভাবাই হয় না, অভিমন্যুর ক্ষেত্রেও অনেকটা তেমনই ঘটেছিল। ২০১৩–’১৪ মরশুমে রনজি অভিষেক হলেও বাংলার একদিনের দল বা টি২০ দলে সুযোগ পাচ্ছিলেন না। বাংলার নির্বাচকদের ধারণা ছিল, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ততটা দক্ষ নন অভিমন্যু। রনজি অভিষেকের দু’বছর পর বাংলার একদিনের দলে সুযোগ। আরও দু’বছর পর টি২০ দলে। লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে পাঁচ–পাঁচটি সেঞ্চুরির মালিক। গড় ৫০–এর বেশি। টি২০–তে স্ট্রাইক রেট ১৩২–এর ওপর। তবু এখনও আইপিএলের কোনও ফ্র‌্যাঞ্চাইজি তাঁর কথা ভাবেনি। অনেকের ধারণা, তাঁর ব্যাটিং স্টাইল টি২০–র উপযুক্ত নয়। ‘সীমাবদ্ধতা’ কাটিয়ে জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে পারবেন?‌ কাজটা কঠিন। বিরাট কোহলির দলের সদস্য হতে গেলে এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে অভিমন্যুকে। 
চলতি মরশুমের শুরু থেকেই বঙ্গক্রিকেটে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নাম ভেসে উঠছিল। তাঁকে ছাড়া আর কাকেই বা ভাবা যেত?‌ ঋদ্ধিমান সাহা দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন। তাছাড়া জাতীয় দলের জন্য তাঁকে সবসময় পাওয়াও যাবে না। তাই‌ অজাতশত্রু, নির্বিবাদী অভিমন্যুকে মনোজ তেওয়ারির পরিবর্ত হিসেবে বেছে নিতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি সিএবি কর্তারা। 
ইতিহাস বলছে, দিল্লি থেকে উড়ে এসে বঙ্গক্রিকেটকে একদা দিশা দেখিয়েছিলেন এক ক্রিকেটার। এবার কি আরেক প্রবাসী অধিনায়কের হাত ধরে জেগে উঠবে বাংলার ক্রিকেট?‌ অভিমন্যু কি অরুণলাল হতে পারবেন? পরাজয়ের চক্রব্যূহ থেকে বার করতে পারবেন বাংলার ক্রিকেটকে? 

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top